Home » ঈদুল আযহা— ত্যাগ তিতিক্ষার মহোৎসব

ঈদুল আযহা— ত্যাগ তিতিক্ষার মহোৎসব

Advertisements In Feed
Advertisements

‘ঈদুল আযহা’ শব্দ দুটি আরবি। ‘ঈদ’ শব্দটি ‘আওদ’ থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ ফিরে আসা। পুনঃপুনঃ আসা। ‘আযহা’র শব্দমূল ‘উযহিয়্যা’। ‘উযহিয়্যা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ কোরবানীর দিন পশু জবাই করা। শরিয়তের পরিভাষায়,আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পশু জবাই করাকে কোরবানী বলা হয়। কোরবানীর তাৎপর্য হলো ত্যাগ, তিতিক্ষা ও প্রিয়বস্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য উৎসর্গ করা।

বছর ঘুরে ফিরে আসছে ঈদুল আযহা। ত্যাগ তিতিক্ষার মহোৎসব। শান্তি, সৌহার্দ্য আর আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে এই উৎসব। এই ঈদের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কোরবানী। কোরবানী হলো আল্লাহর প্রিয় হবার এক সুবর্ণ সুযোগ। সেই সুযোগ যেন হাতছাড়া না হয়— সেদিকে নজর রাখতে হবে সবাইকে। পবিত্র ঈদুল আযহা আমাদের দোরগোড়ায়। মুসলিম বিশ্ব ত্যাগ তিতিক্ষা ও আনন্দের এই ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ইসলামের মৌলিক আহকামের অন্যতম কোরবানী। এটি ইসলামের প্রতীকী বিধান। সুতরাং কোরবানীর মাধ্যমে আল্লাহর আনুগত্য লাভে ধন্য হওয়া যায় এবং গরিব-অসহায় ও পাড়া-প্রতিবেশীর আপ্যায়নের ব্যবস্থা হয়। আদম আ. থেকে শুরু করে সব নবীর যুগেই ভিন্ন পন্থায় কোরবানী পালিত হয়েছে।
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন- “আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামায পড়ুন এবং কোরবানী আদায় করুন।”  (সূরা কাওসার:২)
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলছেন, “হে রাসূল! আপনি বলুন, নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার কোরবানী, আমার জীবন এবং আমার মরণ সবকিছু কেবল বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ তায়ালার জন্য।” (সুরা আনআম : ১৬২)

জিলহজ মাস পুণ্যের মাস। এ মাসের তাৎপর্য অনেক। জিলহজের প্রথম দশদিন বরকতময়। বছরের অন্যান্য দিনগুলো থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ দশদিনে আল্লাহর নৈকট্য লাভে ধন্য হওয়া যায়। ওই দিনগুলো সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন-“শপথ ফযর-কালের এবং দশ রাতের এবং জোড় ও বেজোড়ের।” এ মাসে ইসলামের পঞ্চমতম স্তম্ভ হজ্জ পবিত্র মক্কায় সংঘটিত হয়।
জিলহজের নয় তারিখ পবিত্র আরাফার ময়দানে জমায়েত হন পুণ্যার্থী হাজীগণ। মুনাজাত করেন খোদার দরবারে। এই দিন আল্লাহ সকল গুনাহগারের গুনাহ মাফ করে দেন। এককথায় জিলহজ মাস কয়েকটি আমলের মোহনা।

ঈদুল আযহা বা কোরবানীর তাৎপর্য কী? কেন এ কোরবানী। ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা কেন গুরুত্ব সহকারে পালন করে আসছেন এ উৎসব? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে আমাদের ফিরে যেতে হবে হাজার বছর আগের এক ঐতিহাসিক ঘটনার দিকে।
হযরত ইবরাহিম আ. ছিলেন খুবই সহজ-সরল প্রকারের মানুষ। আল্লাহর প্রেরিত নবী। বরং আল্লাহর নিকটতম বন্ধু। প্রচলিত কোরবানি মূলত হযরত ইবরাহিমের এক অপূর্ব আত্মত্যাগের ঘটনারই স্মৃতিবাহক। তিনি আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী। তিনি অহংকার ও ঐশ্বর্যের জীবন যাপনে মোটেই উৎসাহী ছিলেন না। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক বৈষম্য দূর করে সবার জন্য সমতা রক্ষার পক্ষপাতী ছিলেন তিনি। দেশের তখনকার স্বৈরাচারী রাজা দেশকে এবং প্রজাদের জীবনকে রাজশক্তির ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করছিল। এ সময় বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা করে তথা রাজশক্তি স্বীকার করে জীবনযাপন করতে জোরপূর্বক বাধ্য করছিল মানুষকে। নির্যাতনের হার দিনদিন বেড়েই চলছিল। মানুষ সহায় ও পরিত্রাণ খুঁজছিলেন।
কিন্তু ইবরাহিম আ. স্বৈরাচারী রাজার আচরণ মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। একজন সাধারণ মানুষ কীভাবে নিজেকে ঈশ্বররূপে বা সব বিচারের ঊর্ধ্বে বলে দাবি করতে পারেন? তিনি দেখলেন মানুষের জীবন ক্রমে অজ্ঞতা ও অন্ধকারের দিকে এগিয়ে চলেছে। চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটছে না। জগতের সবকিছু সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণ এক মহাশক্তি ব্যতীত অন্য কারো ক্ষমতায় নয়। এসব বস্তু তাড়া দিচ্ছিল তাঁকে। তিনি বাতিলের পতন ঘটাতে প্রচেষ্টায় লেগে যান। বস্তুত এই পথ ছিল খুবই কণ্টকাকীর্ণ। এই পথে হাঁটতে অনেক হোঁচট খেতে হয়। ইবরাহিম আ. কেও অনেক পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছে। কিন্তু অবশেষে তিনি সফল হয়েছেন ।
হযরত ইবরাহিম আ. বার্ধক্যে উপনীত হন— তখনও তাঁর কোনও সন্তান ছিলেন না। আল্লাহর কাছে খুঁজতে থাকেন। মহীয়ান আল্লাহর হুকুমে ইবরাহিম আ. বার্ধক্যজনিত অবস্থায় এক সন্তানের বাবা হলেন। তিনি হলেন ইসমাইল আ.। একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী ইবরাহিম আ. আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় রাতদিন তন্ময় হয়ে থাকতেন। আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন ইবরাহিম তাঁর প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল আ.-কে কোরবানী করার হুকুম স্বপ্নযোগে প্রাপ্ত হন। পরদিন তিনি পুত্র ইসমাইলকে ডেকে বললেন, ‘হে বৎস! আমি স্বপ্নে আদেশ পেয়েছি যে, তোমাকে আমি জবাই করছি, এখন তোমার অভিমত কী বল?’ পুত্র ইসমাইল বললেন, ‘হে আমার পিতা! আপনি যে আদেশ পেয়েছেন তা পালন করুন। আমাকে আল্লাহর নামে উৎসর্গ করে আপনার পরীক্ষা ও ত্যাগের প্রমাণ দিন, আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।’ সে যুগে পিতার হাতে আপন পুত্রের এ কোরবানীর কথা মানুষের কল্পনারও বাইরে ছিল। তার উপর বার্ধক্যে এসে পাওয়া একমাত্র সন্তানকে কোরবানী দেওয়া কতই না কষ্টকর। কিন্তু ইবরাহিম তখন আল্লাহর উদ্দেশ্যে জানালেন ‘হে প্রভু, আপনার সন্তুষ্টি লাভে আমার সবচেয়ে প্রিয় পুত্রের জীবন পর্যন্ত কোরবানী করতে প্রস্তুত।’ এরপর নিজ চোখ বেঁধে ইবরাহিম পুত্র ইসমাইলকে ছুরি দ্বারা কোরবানী দিতে উদ্যত হলেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে পুত্রের স্থলে দুম্বা (ছাগল জাতীয় পশু) কোরবানি হয়ে গেল। ইবরাহিম হতভম্ব হয়ে দেখেন পুত্র ইসমাইল তাঁর পাশে দাঁড়ানো। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন ইবরাহিম। আল্লাহ তাআলা তাঁর উপর রাজি হন।
অতীতের এই উৎসর্গের স্মৃতিকে আল্লাহর নির্দেশে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সা. মানুষকে স্মরণীয় রাখার আদেশ দিয়েছেন। ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে পশু কোরবানী করে আদেশ পালন করেন। তাই ইসলাম ধর্মে মূলত হজরত ইবরাহিম আ.-এর পুত্রকে কোরবানী দেওয়ার এ অবিস্মরণীয় ঘটনাকে প্রাণবন্ত করে রাখার জন্যই আজও পশু কোরবানী দেওয়া হয়।

কোরবানীর সময় জিলহজের ১০ থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত। এ তিন দিনের যে কোনো দিন কোরবানি করা যাবে। তবে প্রথম দিন কোরবানী করা সর্বাপেক্ষা উত্তম।
কোরবানির গোশত নিজের পরিবারের সদস্যদের খাওয়া ছাড়াও আত্মীয়স্বজন এবং দরিদ্র লোকদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। গোশত তিন ভাগ করে একভাগ পরিবার-পরিজনের জন্য, একভাগ আত্মীয়স্বজনের জন্য এবং একভাগ দরিদ্র লোকদের জন্য দেওয়ারও বিধান রয়েছে।

জিলহজ মাসের নবম তারিখের ফজর থেকে তেরো তারিখের আসর পর্যন্ত প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক বুদ্ধিমান মুসলিম নারী-পুরুষের জন্য একবার তাকবিরে তাশরিক বলা ওয়াজিব। উল্লেখ্য, পুরুষের জন্য উচ্চস্বরে আর নারীদের জন্য নীরবে। 
তাকবিরে তাশরিকটি হচ্ছে- ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার। লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।

কোরবানির ফজিলত হাসিল করতে হলে যে আবেগ-অনুভূতি, প্রেম, ভালোবাসা ও ঐকান্তিকতা নিয়ে আল্লাহর বন্ধু হযরত ইবরাহিম আ. কোরবানী করেছিলেন, সেসব নিয়েই কোরবানী করতে হবে। শুধু গোশত ও রক্তের নাম কোরবানি নয়। বরং আল্লাহর রাহে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়ার এক দৃপ্ত শপথের নাম কোরবানী। আল্লাহ তাআলা বলেছেন- “আল্লাহর কাছে না পৌঁছে তাদের গােশত আর না তাদের রক্ত, বরং তাঁর কাছে তােমাদের তাকওয়াই পৌঁছে।” সমগ্র বিশ্বের মানুষের কাছে এক অনুপম দৃষ্টান্ত প্রদর্শনের উৎসব হয়ে উঠুক ঈদুল আযহা। আমীন
আবু সুফিয়ান লস্কর,
মাটিজুরি হাইলাকান্দি।

Rashid Qasimi

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top