Home » এক অনন্য ব্যক্তিত্ব আল্লামা তৈয়ীবুর রহমান বড়ভূইয়া রাহঃ।

এক অনন্য ব্যক্তিত্ব আল্লামা তৈয়ীবুর রহমান বড়ভূইয়া রাহঃ।

Advertisements In Feed
Advertisements

আমীরে শরিয়ত আল্লামা তৈয়ীবুর রাহমান ছিলেন এক চেতনা। ইলম ও আমলের মোহনা। তিনি ছিলেন জ্ঞান ও প্রজ্ঞার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।প্রেরণার এক সমুজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। তিনি ছিলেন বরাকের জ্যোতি। উত্তর-পূর্বের দ্যুতি । তিনি ছিলেন রাসুলের সুযোগ্য উত্তরসূরি । যুগশ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক দিশারী । আদর্শ চরিত্র সুষমায় তিনি উন্নীত। যার কীর্তিগাঁথায় গোটা পূর্বোত্তরবাসী গর্বিত ও গৌরবান্বিত ।

তিনি ছিলেন একাধারে প্রতিথযশা আলিমে দ্বীন, আদর্শ শিক্ষক, সুসংগঠক, লেখক, গবেষক, রাজনীতিবিদ, ফেকাহ শাস্ত্রবিদ, ইতিহাসবিদ, স্বাধীনতা সংগ্রামী,কুসংস্কার নির্মলকারী,তিনি ছিলেন তৃষিত মরুতে আবে হায়াত সিঞ্চনকারী, ভারত-বাংলায় হিদায়াতের রৌশনি বিকিরণকারী,ছিলেন আধ্যাত্মিক গুরু। ছিলেন আল্লাহর পথের এক মহান দাঈ, ইলমে ওহী’র এক আলোকস্নাত এক শ্রেষ্ঠ মনীষা, শান্তির এক গর্বিত বার্তা বাহক, ইসলামী পুনর্জাগরণ আন্দোলনের বিশিষ্ট নায়ক, হাইলাকান্দির মাটিতে জন্মগ্রহণকারী , উম্মতের রাহবার ও মুরব্বী, সত্যের বাণী উচ্চারণে চিরঅক্লান্ত, কল্যাণের পথের আহ্বানে চিরজাগ্ৰত।

নতুন করে তাঁর পরিচয় তুলে ধরার কোনো অবকাশ আছে? নেই! আগে থেকেই তিনি সুপরিচিত। তাঁকে কোন শব্দচিত্রে চিত্রিত করার কোনো সুযোগ নেই, তা যতো সুসংহতই হোক। শব্দচিত্রের সকল ক্ষুদ্রতা ও সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে আপন মহিমায় তিনি মহিমান্বিত। আপন জ্যোতির্লোকে তিনি চিরউদ্ভাসিত।

তাঁর গৌরবগাঁথা জীবন নিয়ে আলোচনা ! তাঁর কীর্তিগাঁথা প্রতিটি কর্ম পর্যালোচনা।
আমাদের সাড়া জাগায়। যাত্রাপথে খোরাকি জোগায়। মূল কথা হলো,অলিদের জীবন নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা তাঁর পরবর্তীদের জন্য শিক্ষণীয়।

এমন মহান মনীষী তিনি। যার মহানুভবতার প্রকাশ ঘটেছে ছোট বেলায়। স্কুলে আসা-যাওয়ায়। তখনই ছিলেন সবার চেয়ে আলাদা। মেধাবী হওয়ার সাথে ইসলামী চরিত্রে চরিত্রবান। কারণ তিনি গড়ে ওঠেন এমন বাবা-মায়ের সান্নিধ্য পরশে। যারা ছিলেন দুনিয়া বিমুখী। লৌকিকতাপূর্ণ দুনিয়া তাদেরকে অভিভূত করতে পারেনি। তাইতো তাদের পরিবার ছিলো ইসলামী পরিবার। আদর্শ পরিবার। আল্লাহপ্রেমী পরিবার। খোদাভীরু পরিবার। তাতেই লালিত হয়ে বেড়ে ওঠেছেন আমীরে শরিয়ত।
যখন তিনি একে একে বেড়ে ওঠেন। চলে যান হাইলাকান্দি সিনিয়র মাদ্রাসায় । ইসলামী জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে। সেখানে ছিলেন তিনি সবার চেয়ে বিরল। আদর্শ ছাত্র। পড়াশোনা যেমন পাকা তেমনি চরিত্রও ছিলো ঝরনাস্বচ্ছ। তাঁর মাঝে ছিলো না লৌকিকতা। ছিলো না অহংকারের ছাপ। ছিলো না হিংসা-বিদ্বেষের কোন বিন্দু-রেখা।
হাইলাকান্দি সিনিয়র মাদ্রাসায় শিক্ষার্জনের পরিসমাপ্তি ঘটালেন। এবার যাত্রা করলেন বদরপুরে। বরাকের ঐতিহ্য আল-জামিয়ায়। শায়খে বদরপুরীর সান্নিধ্য পেতে। সুললিত কণ্ঠে হাদিস শিক্ষা অর্জন করতে।
বদরপুরে শিক্ষালাভ সমাপ্ত। বাড়ি ফিরলেন। বাড়িতে এসে আব্বার নির্দেশে হাইলাকান্দি সিনিয়র মাদ্রাসায় শিক্ষকতায় নিয়োজিত হলেন।
তখন ১৯৫৭ সালের ৬ জানুয়ারী। দীর্ঘ ১৯ বছর যোগ্যতার সাথে শিক্ষকতার পর ১৯৭৬ সালে অধীক্ষকের গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয় তাঁর কাঁধে। এ গুরুদায়িত্ব পালন করেন অতি নিষ্ঠার সহিত দীর্ঘ ২০ বছর।

তিনি শুধু ছিলেন না একজন শিক্ষক। ছিলেন নববী চিন্তাধারার এক প্রতিষ্ঠিত বাহক। সমাজের তরে সঁপে দিয়েছিলেন নিজেকে। দেশ-বিদেশে চলে যেতেন ইসলামের খাতিরে। মানবকোলে কোরআনের বাণী পৌঁছাতে। সুশীল সমাজ গঠনের লক্ষ্যে।

নগ্নতা ভরা সমাজের কূটনীতি তাকে ভাবাতো।
দুর্নীতি দমন করতে থাকতেন সর্বদা প্রবৃত্ত।

টগবগে যৌবনে যখন সব থাকেন প্রেমের ইন্দ্রজালে ফাঁসা। শয়তানী কুকর্মে জোড়া। সংসারের মায়ামোহে ডুবা। সে বয়সে তিনি ছিলেন এক বিরল ব্যক্তিত্ব। ছিলো না কোন দুশ্চিন্তা। ছিলো না লৌকিকতা ও বিলাসিতা। থাকতেন জিকিরে মশগুল। মুসলিম সমাজ নিয়ে ফিকিরে ব্যস্ত। তাঁর রাতদিন চলতো সমান হারে । রাতের আঁধার আর দিবসের আলো। চলতো যেতায় আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের অধ্যবসায়। দ্বীনের একনিষ্ঠ খাদিম হয়ে কতো কিছু করেছেন এ যৌবনে।

দ্বীনের প্রতি তাঁর অনুরাগ। কুসংস্কার দমনের ব্যাকুলতা। ইসলাম প্রচারের জন্য তাঁর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তাঁকে সরকারি মাদ্রাসার খিদমতে শুধু আটকাতে পারেনি। বরং সুষ্ঠু সমাজ গঠনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেন নিজ গ্ৰাম রাঙাউটিতে জামিয়া ইসলামীয়া তৈয়ীবিয়াহ। যেটি হবে উলামা গড়ার কারখানা। যেখান থেকে গড়ে উঠবেন উলামায়ে ইসলাম। যারা বিশ্বের আনাচে কানাচে পৌঁছবেন। উড্ডীন করবেন ইসলামের বিজয়ী পতাকা।

তিনি ছিলেন পরিপূর্ণ ইসলামী ব্যক্তিত্ব। ইসলাম মিশে ছিলো তাঁর রক্ত-কণিকায়, অস্থি-মজ্জায়। ইসলামই ছিলো তাঁর শুরু, ইসলামই ছিলো তাঁর শেষ। ইসলামের সাথে তাঁর বন্ধন ছিলো অটুট- অবিচ্ছিন্ন আমরণ-বহমান। ইসলামই ছিলো তাঁর কর্ম-দিবসের ব্যস্ততা এবং ঘুম-রজনির স্বপ্ন। ইসলামকে কেন্দ্র করেই প্রবাহিত হয়েছে তাঁর জীবনের সকল ধারা।

তিনি ছিলেন কোরআনী।কোরআনই ছিলো তাঁর প্রথম এবং প্রধান উৎস। কুরআনই ছিলো তাঁর শক্তি সঞ্চয়ের কেন্দ্র। কুরআনই ছিলো তাঁর সকল অনুরাগের ঠিকানা। কুরআনই ছিলো তাঁর জীবন বিধান। কুরআন তিলাওয়াত ছিলো তাঁর কাছে এক মহিমান্বিত ইবাদত। এই ইবাদতে আন্দোলিত হতো তাঁর ঠোঁট। আলোড়িত হতো তাঁর মন। অশ্রু বিগলিত হতো তাঁর চোখ। তখনই ‘তিনি হারিয়ে যেতেন’ কুরআনের মর্মে ও গভীরে। আর কুড়িয়ে আনতেন মণি মুক্তা জহরত।

তিনি ছিলেন মুহাম্মদী। ছিলেন সুন্নাহ ও রাসুলপ্রেমী। রাসুলকে তিনি আদর্শ বানিয়েছিলেন। যার প্রমাণ পাওয়া যায়; প্রতিটি মুহুর্তে সুন্নতের ওপর তাঁর পাবন্দি দেখে।

তিনি ছিলেন উত্তর পূর্ব ভারতের মহামান্য আমীরে শরীয়ত। টগবগে যৌবন থেকে চালিয়ে আসা ইসলামের খিদমত; তাঁকে পৌঁছেছিলো সফলতার স্বপ্নিল ভুবনে। যে মাঠে যেতেন; তিনিই থাকতেন সর্বেসর্বা। জ্ঞানে হোক বা কর্মে। হোক চরিত্রে বা গুণে। তিনি ছিলেন যোগ্য গুরুর যোগ্য শিষ্য। প্রথম আমীরে শরীয়তের জীবনাবসানের পর ১৯৮৯ সালে বিনা মতবিরোধে আমীরে শরিয়ত নির্বাচিত হলেন সেই রাঙাউটির কৃতী সন্তান । আল্লামা তৈয়ীবুর রাহমান বড়ভুইয়া রহঃ।

তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বক্তা। তিনি যে মাহফিলে উপস্থিত হতেন। থাকতো পেণ্ডেলগুলো মানুষে টইটম্বুর। সৃষ্টি হতো জান্নাতী পরিবেশ। অনুষ্ঠান হতো অপূর্ব-দৃষ্টিনন্দন-হৃদয়কাড়া । উপস্থিতি থাকতো হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসলমান ও অমুসলিম ভাইদের। তাঁর সাজানো গোছানো কথায় শ্রোতারা মুগ্ধ কেনো! প্লাবিত হতো। তাঁর ভাষণের প্রাণময়তা ও উষ্ণতা শ্রোতাদের কর্ণকুহর জয় করে নিতো। তাঁর হৃদয়স্পর্শী আওয়াজের বক্তব্যে প্রাণবন্ত হয়ে উঠতো অনুষ্ঠান। মধুময়-স্মৃতিময়-স্বপ্নময় অভিব্যক্তির কী দ্যুতিময় ছড়াছড়ি থাকতো তাঁর বয়ানে।

তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট আলিমে দ্বীন। ফেকাহশাস্ত্রে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য। হাদিস শাস্ত্রের অতল গভীরে তাঁর বিচরণ । জাগতিক শিক্ষায় তাঁর বিদ্যাবত্তা এবং আধ্যাত্মিক ময়দানে তাঁর পরিক্রমণ; তাকে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা লাভ করিয়ে ছিলো। যার প্রমাণ পাওয়া যায়; ভারতের বিভিন্ন সংগঠনের সাথে তাঁর নিযুক্তি দেখে।
•তিনি ছিলেন অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল লো বোর্ডের আজীবন সদস্য এবং কার্যকরী সদস্য।
• তিনি ছিলেন সর্বভারতীয় ফেকাহ একাডেমির এক নির্ভরশীল সদস্য।
• তিনি ছিলেন সর্বভারতীয় মিল্লি কাউন্সিলের আজীবন সদস্য।
• তিনি ছিলেন সর্বভারতীয় মুসলিম মজলিসে মুশাওরতের এক নিষ্ঠাবান সদস্য।
• তিনি ছিলেন দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা লক্ষ্ণৌ এর মজলিসে শুরার সদস্য।

তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠিত লেখক ও প্রাবন্ধিক। তাঁর তথ্যবহুল লেখা পাঠক মহলে বিপুলভাবে সাড়া জাগিয়েছে। পাঠক নন্দিত হওয়ার সব মঞ্জিলই পেরিয়েছে। এছাড়াও তাঁর নিজ হাতে লেখা অনেক বিষয়ভিত্তিক পুস্তকাদি পাঠক কোল কেড়ে নিয়েছে সসম্মানে।

নিঃসংকোচে বলতে পারি। তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট সমাজসংস্কারক ও সমাজসেবক। রাজনীতিবিদ ও সংস্কৃতিসেবী। এ বিষয়ে তাঁর ব্যক্তিত্বের পরিচায়ক হবে; যে ১৮ টি সম্মাননা-পুরস্কার লাভ করেছিলেন; তার দীর্ঘ ইতিহাস।

তিনি ছিলেন জগতখ্যাত আধ্যাত্মিক গুরু। আধ্যাত্মিক জ্ঞান সাধনকারী। আল্লাহর পেয়ারা বান্দা ও অলিয়ে কামিল। তাঁর জীবন ছিলো আল্লাহর আরাধনায় উৎসর্গিত। আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের পথে সাধিত। ছিলেন জনপ্রিয় মুর্শিদ। দেশ বিদেশে ছড়িয়ে রয়েছেন তাঁর মোবারক হাতে বয়াত গ্ৰহণকারী সাত লক্ষ মুরিদ।
বছরের অধিকাংশ সময় ঠাসা কর্মসূচি থাকতো। থাকতো উত্তর পূর্ব ভারতের প্রান্তে প্রান্তে খানক্বাহ। সব খানক্বাহয় তিনি থাকতেন শায়েখ ও পরিচালক।

এই হলেন আমীরে শরীয়ত। যার গগনচুম্বী জনপ্রিয়তা প্রমাণিত হয়েছে তাঁর শেষকৃত্যে। ৫ লক্ষাধিক শোকমথিত, আবেগপ্লাবিত, অশ্রু ছলোছলো শোকার্তের উপস্থিতিতে। বিশাল জানাজার মাঠে।
তাঁর মতো বহুমুখী ব্যক্তিত্বের সকল দিক নিয়ে আলোচনা স্বল্প পরিসরে সম্ভব নয়। তাই এখানেই ইতিরেখা টানছি।

প্রাবন্ধিকঃ মুহাম্মদ আবু সুফিয়ান
মাটিজুরি ১ম, হাইলাকান্দি।

Rashid Qasimi

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top