Home » করোনাকালে ঈদ-উল-ফিতর

করোনাকালে ঈদ-উল-ফিতর

Advertisements In Feed
Advertisements

ঈদ আরবী শব্দ। ‘আওদ’ শব্দমূল থেকে উদ্ভূত। যার অর্থ হচ্ছে ফিরে আসা, প্রত্যাবর্তন করা বা ভেঙ্গে ফেলা ও বিদীর্ণ করা। ঈদ ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব।ত্যাগ-তিতিক্ষার মাঝে খুশির বন্যা বইয়ে প্রতি বছর ফিরে আসে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর। দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার পর একফালি চাঁদ ঈদ-উল-ফিতরের জানান দেয়। শেষ রমজানের বিকেলে আকাশের কোণে চাঁদ দৃষ্টিগোচর হতেই সবার হৃদয়-মনে বয়ে যায় খুশির জোয়ার। মানুষ আনন্দে মেতে ওঠে। একে-অপরকে শুভেচ্ছা জানায়।
ফিতর অর্থাৎ ভঙ্গ করা,খুলে দেওয়া। ঈদ-উল-ফিতর মানে রোজা ভাঙ্গার দিন। দীর্ঘ এক মাস রোজাব্রত পালনের পর ঈদ-উল-ফিতরের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা বান্দাকে পানাহার ও অন্যান্য বিধি-নিষেধ থেকে মুক্ত করে দেন। তাই এটাকে ঈদ-উল- ফিতর বলা হয়। ঈদ-উল -ফিতরে মুসলিম বিশ্ব আনন্দে মেতে ওঠে। খুশির রাঙা আবির মেখে ছুটে বেড়ায়। আনন্দময় দিন কাটায়। গোটা মুসলিম বিশ্বে বিরাজ করে এক আনন্দঘন স্নিগ্ধ পরিবেশ।
পবিত্র ঈদের সূচনা হয়েছিল দ্বিতীয় হিজরীতে। হযরত আনাস(রাঃ) থেকে বর্ণিত, ‘মহানবী (সাঃ) যখন মদীনা আগমন করলেন, তখন মদিনায় দুটো দিবস ছিল, যে দিবসগুলোতে তারা (মদিনাবাসী) খেলাধুলো ও ফুর্তি-আনন্দ করত। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) জিজ্ঞেস করলেন,এ দু’দিনের তাৎপর্য কী? মদীনাবাসী উত্তরে জানান, আমরা এ দু’দিনে আনন্দ (খেলাধুলো) করি। তখন হুজুর (সাঃ) বললেন, আল্লাহতায়ালা এই দু’দিনের পরিবর্তে এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ দুটো দিন দান করছেন। একটি ঈদ-উল-ফিতর। অপরটি ঈদ- উল-আজহা।'(আবু দাউদ শরীফ,১১৩৬)
হানাফি মাযহাব মতে,ঈদের নামায ওয়াজিব। মহানবী (সাঃ) আজীবন ঈদের নামায আদায় করেছেন। সেই সূচনা লগ্ন থেকে আজ অবধি ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ঈদের সালাত আদায় করে আসছেন গুরুত্ব সহকারে। আনন্দভরা হৃদয়-মনে। গোটা বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমাদের গ্রামবরাকের মুসলমানরাও ঈদ উদযাপন করেন বেশ সাড়ম্বরে। নজরকাড়া উৎসাহ-উদ্দীপনায়। ঘরে ঘরে তৈরি হয় রকমারি খাবার। সব বাড়িতে দেখা যায় খাদ্যসামগ্রীর সমাহার। ঈদ-উল-ফিতরে তুলনামূলক আনন্দ-উৎসাহ বেশি পরিলক্ষিত হয়।
পহেলা শাওয়াল এক মাসের সাধনাময় ও কষ্টসাধ্য রোজা পালনের পরিসমাপ্তি। আর ওপর দিকে বেলায় পানাহারের অনুমতি। এটা যে কত আনন্দদায়ক, কত তৃপ্তিদায়ক! পয়লা শাওয়ালের রাঙা সূর্য উঁকি দিতেই সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন ঈদের খুশি উদযাপনে। বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাস নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। একে অপরকে শুভেচ্ছা বিনিময় করে করে এগিয়ে যান ঈদগাহে। ঈদের নামাজ আদায় করেন সোৎসাহে, আনন্দে প্লাবিত হয়ে হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয় একেক ঈদগাহে। এটাকে শ্রেষ্ঠ মিলনমেলাও বলা যায়। কী ধনী, কী গরিব, সব বরাবর। খুশি করতে, খুশি বিলাতে। সবাই নানান সাজে সজ্জিত হয়ে একই কাতারে সামিল হন। আদায় করেন ঈদের নামায।
প্রতি বছরের মতো এবারও মাসব্যাপী সিয়াম সাধনা করেছেন ধর্মপ্রাণরা। এবারের রমযানটা ছিল আরও পাঁচটি রমজানের চেয়ে আলাদা।অ-নে-ক আলাদা। বিভিন্ন বিধি-নিষেধের মাধ্যমে কাটাতে হয়েছে মাহে রমজান। ছিল না আগের মত তারাবিহের নামায। ছিল না কোলাহলপূর্ণ স্নিগ্ধ পরিবেশ। রমজান শেষে ঈদেও সেই একই চিত্র। চলছে দেশ জুড়ে হাহাকার। দেশে মৃত্যুমিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সরকারি তরফে। উলামায়ে কেরামও লকডাউন ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বারবার আবেদন জানাচ্ছেন। এরই ফাঁক দিয়ে কীভাবে উদযাপন করব খুশির ঈদ? এমন প্রশ্ন অনেকেরই। তবে এবারের ঈদে আমাদের সংযত থাকতে হবে। ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় ও গলাগলি পরিত্যাগ করতে হবে ।থাকতে হবে সতর্ক। শিশু-কিশোরদের ছুটাছুটি বন্ধ করতে হবে। অতিথিদের গমনাগমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে। আড়ম্বরতা ত্যাগ করতে হবে। ঈদের কেনাকাটা থেকে বিরত থাকার আহ্বান আগে থেকেই জানানো হয়েছে। ঈদের দিনে বিশেষ করে অসহায়দের পাশে দাঁড়াতে হবে।
এবার ঈদের নামায কীভাবে আদায় করতে হবে এ বিষয়ে রয়েছে শরীয়তের সুস্পষ্ট নির্দেশনা। আরও অল ইন্ডিয়া মুসলিম পারসনাল লো বোর্ডের তরফেও নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ঈদের দিন দোকানে দোকানে ভিড়ে উপচে না পড়া। ঈদুল ফিতরের নামায আদায়ে বড়ো ধরনের জামায়াত না করা। এবং খোৎবাও ছোট্ট আকারে দেয়া। জামায়াতে দুই কাতারের মধ্যে এক কাতার পরিমাণ ও দুই ব্যক্তির মধ্যে এক মিটার পরিমাণ দুরত্ব বজায় রাখা। মাস্ক সবসময় পরিধান করা। শুধু মুখ দ্বারা ঈদের মোবারকবাদ জানানো, মুসাফা ও মুআনাকা থেকে বিরত থাকা। যে যে এলাকায় সরকারি নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে তা মেনে চলা ইত্যাদি।

ঈদের নামাজ ওয়াজিব। অবশ্য পালনীয়। জুম্মার ক্ষেত্রে যেভাবে চার-পাঁচ জন মিলে মসজিদে এবং বাড়িতে নামায আদায় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল,ঠিক তেমনভাবে ঈদগাহে চার-পাঁচ জন মিলে সালাত আদায় করা যাবে। বাকি সবাই নিজ নিজ বাড়িতে জামাতে ঈদের সালাত আদায় করবেন। এক্ষেত্রে শরীয়ত ছাড় দিয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা(রাঃ)বর্ণনা করেন,’একবার ঈদের দিন বৃষ্টি হল। তখন রাসূলুল্লাহ(সাঃ) তাদের নিয়ে মসজিদে ঈদের নামায পড়লেন।'( আবু দাউদ শরীফ)। ওই হাদিস বাড়িতে ঈদের সালাত আদায়ের বৈধতা দেয়। বৈধতার প্রতি ইঙ্গিত করে। উল্লেখ্য,জামাতে ইমাম ছাড়া চারজন মুসল্লী হওয়া আবশ্যক। এর চেয়ে কম হলে চলবে না।বর্তমান পরিস্থিতিতে কেউ যদি কোনও অসুবিধার দরুন ঈদের নামায আদায়ে সক্ষম না হন, তাহলে গোনাহগার হবেন না। তাই অনুশোচনায় দগ্ধ না হয়ে চার রাকাত চাশতের নামাজ আদায় করতে পারেন। আর এটা হবে মুস্তাহাব। এতে বিশেষ সওয়াব রয়েছে।
ঈদের খুতবা পড়া সুন্নত। সংক্ষিপ্ত আকারে ঈদের খুতবা পাঠ করা উত্তম। তাছাড়া নামাযে ছোট ছোট সূরা পাঠ করে সংক্ষিপ্তভাবে আদায় করাই সময়ের দাবি।

আবু সুফিয়ান
বাঁশডহর ১ম, হাইলাকান্দি

Rashid Qasimi

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top