Home » কাঁদছে মানুষ। কাঁদছে আলজামিয়া ।

কাঁদছে মানুষ। কাঁদছে আলজামিয়া ।

রেল শহর বদরপুর। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বদরপুর। ওলি আউলিয়াদের পদচারণায় ধন্য বদরপুর। জ্ঞান শহর যার পরিচিতি। রয়েছে দেশ বিদেশে সুখ্যাতি । ঐতিহ্যবাহী এই শহরের বুক চিরে শির উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল একটি প্রতিষ্ঠান। আলজামিয়া। এটা শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়। একটি বিপ্লব। একটি জীবন্ত ইতিহাস। আলজামিয়া! অনুপম ভালোবাসার প্রতীক। ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতীক। নবজাগরণের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। শত বছর ছুঁই ছুঁই এই প্রতিষ্ঠান উত্তর পূর্ব ভারতের মুসলমানদের চোখের মণি। হৃদয়ের প্রশান্তি।

আলজামিয়া খ্যাত দেওরাইল টাইটেল মাদ্রাসা দিয়েছে সমাজকে অনেক কিছু। দিয়েছে এক ঝাঁক সুযোগ্য আলিম উপহার, যারা জাতির নেতৃত্ব দিয়েছেন। কী ধর্মীয় অঙ্গন, কী রাজনীতির প্রাঙ্গণ। কী সমাজসেবা, কী শিক্ষাবিস্তার। সবকটি ক্ষেত্রে এখানকার প্রাক্তনীদের দান অবদান চোখ ধাঁধানো। হৃদয়জুড়ানো। আলজলীলীগণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পূর্বোত্তরের মুসলমানদের সফল প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং করছেন। এদের কেউ দেশ ও জাতির জন্য কলম হাতে নিয়েছেন। তো কেউ ধরেছেন মাইক। চষে বেড়িয়েছেন ‌মাঠে ময়দানে। কথা বলেছেন কখনও দরদমেখে। আবার কখনও বীরদর্পে। তারা বিদায়াত ও কুসংস্কার মুক্ত সমাজ গড়তে আন্দোলন করেছেন। সুন্নাতের প্রচারাভিযান চালিয়েছেন । যতসব সমালোচনা আর বিরোধিতা সহ্য করেছেন। আপন আপন লক্ষ্য পূরণে কাজ করেছেন। উত্তর পূর্ব ভারতের মুসলমান স্মরণ করবেন আলজামিয়ার দান-অবদান। ইতিহাসের পাতায় আলজামিয়া থাকবে চিরঅম্লান।

আলজামিয়া! পূর্বোত্তরের মুসলমানদের হৃদয় গহীনে ঠাই করে নেওয়া একটি নাম। কেন আলজামিয়ার এ মর্যাদা? কেন মানুষের এত ভালো লাগা? আসলে আলজামিয়া উত্তর পূর্ব ভারতে একটি বিপ্লব সৃষ্টি করেছে। জন্ম দিয়েছে একটি নবজাগরণ। এনেছে একটি পরিবর্তন। এখানকার পড়ুয়ারা জাতির জন্য কাজ করেছেন এবং করছেন। এখানকার পড়ুয়ারা আখলাক-আদব, চলাফেরা, উঠাবসা, কথাবার্তা এবং বেশভূষা ইত্যাদি সব ক্ষেত্রে একটু ব্যতিক্রমী। একটু আলাদা। সমাজ এদেরকে পর্যবেক্ষণ করে। মূল্যায়ন করে। শ্রদ্ধা করে । সমীহ করে।

ইতিহাসের পালাবদলে‌ আলজামিয়া আজ দেওরাইল হাইস্কুল। সরকার যখন সরকারি মাদ্রাসাগুলোকে স্কুলে রূপান্তরিত করার কথা ঘোষণা করেছিল। তখন আমজনতার ছিল একটা আবেগঘন প্রশ্ন। একটা উদ্বেগভরা জিজ্ঞাসা । আলজামিয়ার কী হবে? প্রাণপ্রিয় এই প্রতিষ্ঠানের স্কুলে রূপান্তর মেনে নিতে পারছিল না জনতা। একই সাওয়ালের মুখোমুখি হয়েছি কতবার। কতভাবে। কত জায়গায়। জলিলী উদ্যান মানুষের প্রিয় প্রতিষ্ঠান। এমন একটা ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের এমন দুর্দশা সত্যিই কষ্টদায়ক। সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক।

আলজামিয়া ছিল হাদিসের সবুজ উদ্যান। এখানকার গগণ পবন মুখরিত থাকতো কালাল্লাহু ও কালা রাসুল সাঃ এর সুরে। এখানকার বিশাল ক্যাম্পাস জুড়ে থাকতো ছাত্রদের আনাগোনা। পঠন পাঠনের অপূর্ব সুন্দর পরিবেশ। কী মনমাতানো আবেশ। ছাত্রদের গায়ে সাদা ধবধবে জুব্বা, মাথায় সাদা গুল টুপি। হাতে মিসওয়াক তাসবিহ। এমন ব্যতিক্রমী দৃশ্য আমজনতাকে আকর্ষণ করতো। আর আজ! কালের আবর্তন ঘটেছে। একসময়ের ব্যস্ততম ক্যাম্পাস আজ জনশূন্য। ছাত্রপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটি ছাত্রশূন্য। নেই ছাত্রদের গমনাগমন। নেই সাদা জুব্বা আর সাদা টুপির সেই ঝলক। গোটা ক্যাম্পাস আজ মৃতপ্রায়। মাদ্রাসাটির দিকে তাকালে মনে হয় কাঁদছে।অশ্রু ফেলছে। নিরবে আর্তনাদ করছে। যে প্রতিষ্ঠানের শুভাবর্ধন করেছিলেন শায়খ বায়মপুরী রাহঃ,শায়খ বদরপুরী রাহঃ ,শায়খ ধর্মনগরী রাহঃ,শায়খ দিঘীরপারী রাহঃ সহ যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসগণ। সেখানে আজ পাঠদান করবেন রাম,সাম আর যদু, মধু। যেখানকার কোনায় কোনায় ইলমে নবওয়ী চর্চার আওয়াজ গুঞ্জরিত হত। সেখানে আজ সায়েন্স আর মেথস এর আওয়াজ উঠবে। এমন দৃশ্য সত্যিই পীড়াদায়ক। এই তো কদিন আগে একজন বললেন, “হুজুর আমি আলজামিয়ার দিকে তাকাতে পারি না। তাকালে অশ্রুসিক্ত হই।” কী অপূর্ব ভালোবাসা । কী আশ্চর্য টান । কী আবেগমথিত কথা। শুধু তার নয়। আপনার। আমার । সবার।

আলজামিয়া । একটি রেনেসাঁ। একটি ইতিহাস। নদওয়াতুত তামীর এবং এমারতে শরয়ীয়াহ এর মত সুশৃঙ্খল একটা সংগঠন দাঁড় করেছিলেন আলজামিয়ার রূপকার মাওলানা আব্দুল জলিল চৌধুরী রাহঃ। শ্রুতের সম্পূর্ণ বিপরীতে গিয়ে বৈপ্লবিক এই সংগঠনের বহুমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়নে আলজলীলীদের অবদান ছিল যথেষ্ট । বলতে গেলে তারাই ছিলেন সংগঠন বিস্তারের মূল চালিকাটি। তারা কাজ করেছেন মাঠে ময়দানে। ঘরে ঘরে। পাড়ায় পাড়ায়। তৃণমূল পর্যায়ে। সংগঠনকে মজবুত করতে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। আজ! এখান থেকে আর কোনও আলিম গড়ে উঠবে না, যারা কৌম ও জাতির জন্য কাজ করবে। যারা লিল্লাহিয়াতের ভিত্তিতে নিজেকে বিলিয়ে দেবে। সমাজে আনতে চাই পরিবর্তন।

Rashid Ahmed Qasimi

2 thoughts on “কাঁদছে মানুষ। কাঁদছে আলজামিয়া ।

  1. আমাদের হৃদয়ের কথা আপনার কলমে ভেষে উঠায় আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top