Home » খানকায় আলাকুলিপুর ও আমীরে শরীয়ত আল্লামা তৈয়ীবুর রহমান বড়ভূইয়া রাহঃ।

খানকায় আলাকুলিপুর ও আমীরে শরীয়ত আল্লামা তৈয়ীবুর রহমান বড়ভূইয়া রাহঃ।

১৯৫৯ থেকে ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দ। সুদীর্ঘ এই ত্রিশ বছর খানকায় আলাকুলিপুর থেকে আধ্যাত্মিকতার রাঙা কিরণ ছড়িয়েছেন তাসাউফ জগতের রক্তিম সূর্য খলিফায় মদনী হযরত মাওলানা আব্দুল জলিল চৌধুরী রাহঃ। এই তিন দশকে তিনি গড়ে তুলেছিলেন আধ্যাত্মিক জগতের একেক দিকপাল। যাঁরা দিক-দিগন্তে আধ্যাত্মিকতার আলো ছড়িয়েছেন। আল্লাহ বিস্মৃত বান্দাকে টেনেছেন দ্বীনের পথে। সুন্নাতের জগতে। জাগরণ এনেছেন সমাজে। নির্মূল করেছেন কুসংস্কার ও বিদায়াত। রচনা করেছেন নবজাগরণের একেক সোনালি অধ্যায়। জলিলী কাননের যেসব কলির আধ্যাত্মিক সুবাসে সুবাসিত হয়েছিল সমাজ,তাঁদের অন্যতম আল্লামা তৈয়ীবুর রহমান বড়ভূইয়া রাহঃ।

১৯৮৯ সালে আধ্যাত্মিক জগতের ঝলমলে প্রদীপ মাওলানা আব্দুল জলিল চৌধুরী চির নির্বাপিত হন। এতে সৃষ্টি হয় এক বিরাট শূন্যতা। সেই শূন্যতা পূরণ করে ১৯৯০ সালে খানকায় জলিলির হাল ধরেন আমীরে শরীয়ত আল্লামা তৈয়ীবুর রহমান বড়ভূইয়া রাহঃ।

আমীরে শরীয়ত আল্লামা তৈয়ীবুর রহমান বড়ভূইয়া রাহঃ ছিলেন আধ্যাত্মিক জগতের আলো জ্বলজ্বলে নক্ষত্র। শায়খ বদরপুরীর সুযোগ্য শিষ্য। তিনি খানকায় জলিলির হাল ধরেন। হয়ে উঠেন মধ্যমণি। তিনি পরিচালনা করতেন ঐতিহ্যবাহী এই খানকা। তাঁর মোহন পরশে ধন্য হতে জমায়েত হত কতশত লোক। তাঁর সান্নিধ্যে দিন যাপিত করতে ছুটে আসত কাফেলার পর কাফেলা। উপচে পড়া ভিড় পরিলক্ষিত হত। জনসমাগমে মসজিদ হতো টইটম্বুর। এই জনারণ্যে তিল ধারণের জায়গা থাকতো না। কেন থাকত এই জনশ্রোত? কেন এ জমায়েত? আসলে তিনি ছিলেন সত্যিকারের আল্লাহওয়ালা। তাঁর সান্নিধ্যে মানুষ পেত এবাদতের আলাদা স্বাদ ও ভিন্ন‌ এক মজা। তাঁর নির্দেশিত তরিকায় মানুষ পেত তাসাউফের সবুজ পথ । মুখাবয়ব ছিল তাঁর আলোর আঁধার। জবান ছিল জিকির সিক্ত। চুখ ছিল অশ্রুসিক্ত। মুনাজাত ছিল হৃদয় বিগলিত। তাঁর জ্যোতির্মান চেহারার জ্যোতি পাষাণ হৃদয়কে করত মোমনরম।

আলাকুলিপুর খানকায় এতেকাফের সৌভাগ্য হয়েছিল। দেখেছি তাঁর এবাদত মুখর অষ্টপ্রহর। পর্যবেক্ষন করেছি সুন্নতময় উঠাবসা ও চলাফেরা। তাঁর হৃদয় ছোঁয়া মুনাজাতে শরিক হতাম। আনন্দপ্লাবিত হতাম। প্রত্যেহ জোহরের পর থাকত আমীরে শরীয়তের জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা। তথ্য ও তত্ত্ব সমৃদ্ধ ভাষণ। হৃদয়স্পর্শী আলোচনা। ঐ সময়টার অপেক্ষায় থাকতাম অধীর আগ্রহে। হযরত যখন মিম্বরে তাশরিফ আনতেন। তখন হৃদয় মনে বয়ে যেতে আনন্দ জোয়ার। তাঁর নুরানী মায়াবী চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকতাম অনিমেষ চোখে। অপলক দৃষ্টিতে। তাঁর মিষ্টি মিষ্টি উপদেশ আর নরম নরম কথা মন-মননে তোলপাড় সৃষ্টি করত। তিনি বলতেন হৃদয়ের কথা হৃদয়ের ভাষায়। তাঁর প্রজ্ঞাময় বক্তব্যে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের নিগূঢ় রহস্য উদঘাটিত হত। ঘন্টার পর ঘণ্টা চলত তাঁর হৃদয়গ্রাহী আলোচনা। ভীড়ে ঠাসা মসজিদে তখন আরও ভীড় হত। তিল ধারণের জায়গা থাকত না। বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতেন শত শত আল্লাহপ্রেমী। প্রতিদিন বয়ানের পর বয়াত গ্রহন করতেন। কত মানুষ আমীরে শরীয়তের পূত-পবিত্র হাতে বয়াত হতেন। আধ্যাত্মিক জগতের রাঙা পথে হাঁটা দিতেন তার হিসেব কে বা রাখে?

আমীরে শরীয়ত আল্লামা তৈয়ীবুর রহমান বড়ভূইয়া রঃ অবস্থান করতেন নির্দিষ্ট কক্ষে। মসজিদেরই ভিতরে। পাঁচ ওয়াক্তের নামাজে বেরিয়ে আসতেন। পাঁচবার চোখের তাঁরায় ভেসে উঠত তাঁর আলো ঝলমলে প্রদীপ্ত চেহারা। মায়াবী চেহারা। আলোকদ্ভাসিত চেহারা। এতে চোখ জুড়াত। মন জুড়াত। আহ! কী মধুর চিত্র ছিল সেটা! কী আনন্দদায়ক পরিবেশ ছিল সেটা!

আনন্দভরা রাতের মত আশাভরা সকাল থাকত আলাকুলিপুরে। ফজরের পর এতেকাফকারীরা স্বপ্ন বর্ণনা করতেন। মায়া মায়া মুখে হাসি হাসি চোখে যাদুমাখা কন্ঠে স্বপ্ন বিশ্লেষণ করতেন প্রাণপ্রিয় আমীরে শরীয়ত। দ্যুতিত মুখে মায়াবী হাসি ফুটিয়ে প্রাজ্ঞোচিত ও অভিজ্ঞতালব্ধ কন্ঠে ব্যাখ্যা দিতেন। তাঁর বিশ্লেষণ শুনে দ্বিগুণ মুগ্ধতায় পল্লবিত হতাম। এ পর্বটা ছিল বেশ আকর্ষণীয়। বেশ চিত্তাকর্ষক। এই মুগ্ধকর পর্বে সামিল হতে দূর দূরান্ত থেকে আসতেন অনেকে ।

আসরের পরের দৃশ্যটা ছিল ব্যতিক্রমী । নিত্যদিন শত শত মানুষ হতেন হযরতের সাক্ষাৎপ্রার্থী । রীতিমত লাইন ধরে চলত সাক্ষাৎকার পর্ব। সাক্ষাৎকারে অনেকেই নিজের দুঃখ সুখের কথা বলতেন। বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ চাইতেন। কেউ তেল পড়া, জল পড়া কেউ ফুঁক নিতেন। সবার সাথে থাকত তাঁর ভদ্রোচিত ও বন্ধুত্বসুলভ আচরণ। দিন গড়িয়ে ইফতারের সময় ঘনিয়ে আসত। হযরত শুরু করতেন মুনাজাত। তাঁর বিনয় বিগলিত অশ্রুকান্নায় শরিক হয়ে অশ্রু নদীতে ভেসে যেত তাওহিদী জনতা। এশার পর জিকির। নেতৃত্ব দিতেন সবার প্রিয় সেই আমীরে শরীয়ত। হযরতের নেতৃত্বাধীন জিকিরে কী আশ্চর্য স্বাধ ছিল। ছিল বর্ণনাতীত অনুভূতি। যিনি শরিক হয়েছেন, একমাত্র তিনিই অনুধাবন করতে পারবেন সেই স্বাদ। সেই মজা। সেই শান্তি। সেই প্রশান্তি।

গত হওয়া আলাকুলিপুরের মুহুর্তগুলো হৃদয় মাঝে ঝলমল করে উঠে। সেসব তোলপাড় করা অনুভূতি এখন শুধু স্মৃতি আর স্মৃতি। হযরত আজ আর নেই । তাঁর বিরহে হৃদয় সাগরে উঠে শোকের ঢেউ। দুঃখের ঢেউ। হযরতের অবর্তমান বড় একটা ক্ষত। বড় একটা শোক। আজ আলাকুলিপুরও নিরব। নিস্তব্ধ। কোলাহল বিহীন। নেই সেই এবাদত মুখর পরিবেশ। নেই মানুষের কোলাহল। এটা ক্ষতের উপর ক্ষত। শোকের উপর শোক। যে শোকের দহনে জ্বলছি। বেদনা নিঃসৃত অশ্রু প্রবাহে ভাসছি।

Rashid Ahmed Qasimi

9 thoughts on “খানকায় আলাকুলিপুর ও আমীরে শরীয়ত আল্লামা তৈয়ীবুর রহমান বড়ভূইয়া রাহঃ।

  1. হ্যা, আল্লামা তৈয়িবুর রাহমান বড়ভূইয়া রাহ. ছিলেন অনন্য এক ব্যক্তিত্ব। আমীরে শরিয়ত উপাধিটি তাঁর সাথে সত্যিই মানাতো। এই তো গতকাল কোনও এক আলোচনাচক্রে বসলে বরাকভূমিতে তার শূন্যতা হাড়ে হাড়ে অনুভব করেছি। আল্লাহ মরহুমকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন।

  2. Yes of course,gone are the days.it will never come back.Present Ameere shariat sahab is trying to console our saddened souls with his untiring efforts.lets take his leadership as a compensation of the previous two great souls.

  3. আল্লাহ পাক আমাদের প্রাণ প্রিয় হুজুর কে জান্নাতুল ফিরদাউছে উচ্চ থেকে উচ্চতর স্থান দান করুন।আমীন।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top