Home » বক্তা সম্রাট আল্লামা তৈয়ীবুর রহমান বড়ভূইয়া রাহঃ ।

বক্তা সম্রাট আল্লামা তৈয়ীবুর রহমান বড়ভূইয়া রাহঃ ।

Advertisements In Feed
Advertisements

মানুষ মনের ভাব-ভাবনা, চিন্তা-চেতনা, আশা-প্রত‍্যাশা, দুঃখ-সুখ ইত‍্যাদির অভিব‍্যক্তি ঘটায় দুটি মাধ্যমে। এক বাক্ শক্তি। দুই কলমী শক্তি। মহান আল্লাহ একেকজনকে একেকটি নেয়ামত দান করেন। কারও কলম চলে, কারও জবান। কেউ কলম দিয়ে বিপ্লব আনেন। কেউ ভাষণ বক্তৃতার ডানায় ভর করেন। আবার এ ধরাধামে এমন কিছু সৌভাগ্যবান হাতেগোনা মানুষের সন্ধান পাওয়া যায়। যারা ছিলেন এই দুটি নেয়ামতে ভরপুর। তাঁরা উভয়টি কাজে লাগিয়েছেন সমান তালে। তাঁরা ভাগ‍্যিস। সালাম জানাতেই হয় তাঁদের সৌভাগ্যকে। এই সৌভাগ্যবান কাফেলার অন‍্যতম আমীরে শরীয়ত আল্লামা তৈয়ীবুর রহমান বড়ভূইয়া সাহেব। তিনি একাধারে ছিলেন সুলেখক, সুবক্তা। দুই জগতে তাঁর দান-অবদান নজরকাড়া।

আমীরে শরীয়ত আল্লামা তৈয়ীবুর রহমান বড়ভূইয়া সাহেব ছাত্র জীবনের পরিসমাপ্তিতে জড়িয়ে পড়েন ওয়াজ বক্তৃতায়। সেই ১৯৫৪ সাল থেকে আমৃত্যু ওয়াজ নসিহত করেছেন। রেখেছেন ভাষণ- বক্তৃতা। অশীতিপর হয়েছেন। তবুও থমকে দাঁড়ান নি। চালিয়ে গেছেন আমর বিল মারুফ নাহি আনিল মুনকার।

আমীরে শরীয়ত সাহেব জীবনে যে দিকে মনোনিবেশ করেছেন সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছেন। এটা তাঁর চরম ও পরম প্রাপ্তি। ওয়াইজ-বক্তা হিসেবে তিনি ছিলেন সফল। তাঁর দরদমাখা ওয়াজ বক্তৃতায় মানুষ বিমোহিত হত। তাঁর কথামালা ছিল নরম ও হৃদয়োৎসারিত। এতে শ্রোতাদের হৃদয় মন বিগলিত হত। তাঁর উপদেশ ছিল অভিজ্ঞতালব্ধ ও নিষ্ঠাপূর্ণ। এতে মানুষের মনে বিনির্মিত হত তাঁর প্রতি অগাধ আস্থার দুর্ভেদ্য দুর্গ। কম সময়ে তাঁর বক্তৃতার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল চতুর্দিকে । উত্তর পূর্বাঞ্চলের দিকে দিকে তাঁর দ্বীনি দাওয়াতের আওয়াজ গুঞ্জরিত হয়েছিল। এখানকার মানুষ তাঁর জ্ঞান প্রসবীনি ভাষণ শুনে নিজের পাথেয় জোগাড় করেছিল। তাঁর বক্তব্যে তথ‍্য ও তত্ত্বের সমাবেশ ঘটত। উঠে আসত ইতিহাসের বহু নিগুঢ় তথ‍্য। তাঁর বয়ানে সুশীল সমাজ চিন্তা-চেতনার ও ভাব- ভাবনার খোরাক পেত।

তিনি ছিলেন যুগসেরা ওয়াইজ । উত্তর পূর্বাঞ্চলের এমন কোনো জনপদ বোধ হয় নেই,যেখানে দায়ীয়ে ইসলাম দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে শুভপদার্প করেন নি। তাঁর জ্ঞানগর্ব ভাষণ ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়। জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মনে সহজে দাগ কাটতে পারতেন তিনি। সময়োপযোগী বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর তাত্বিক আলোচনা জনমানসে নতুন চিন্তা ধারার দ্বার উন্মুক্ত করত। তিনি সাবলীল ভাষায় বক্তব্য রাখতে অভ‍্যস্ত ছিলেন। তাঁর বয়ানে লৌকিকতার কোনও ছোঁয়া থাকত না। তিনি বক্তৃতা করতেন সমাজে পরিবর্তন আনতে। সমাজকে সার্বিক উন্নতির দিশা দেখাতে। তাঁর বক্তব্যে স্থান পেত ধর্মীয় আলোচনা। কোরআন হাদিস ও নির্ভরযোগ্য কিতাবাদির আলোকে ইসলামী ইতিহাস,দর্শন,সংস্কৃতি এবং আইন নিয়ে কথা বলতেন যাদুমাখা কন্ঠে। ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা প্রবর্তনের অনুরোধ জানাতেন চোখে মুখে দরদ মেখে। মুসলিম সমাজকে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করতেন সুন্দর সুন্দর বাক্যে। একটি আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার কতটা প্রয়োজন; সেটার হাতে কলমে বুঝিয়ে দিতেন বিজ্ঞোচিত কন্ঠে‌। মুসলমানদেরকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করতে ইতিহাসের আশ্রয় নিতেন। বিখ্যাত ঐতিহাসিক গ্রন্থাবলির উদ্বৃতি আওড়ে মুসলিম সমাজকে ইতিহাস চর্চার আহ্বান জানাতেন। ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের উপদেশ দিতেন। ইসলামী সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা মুসলিম উম্মাহর একান্ত কর্তব্য; এটা বুঝিয়ে দিতেন সহজ ভাষায়। মুসলিম সমাজকে শিক্ষা দীক্ষার পথ দেখাতে তিনি ছিলেন বেশ তৎপর। প্রায় সবকটি ভাষণে উচ্চ শিক্ষা অর্জনের বিষয়টি উপস্থাপন করতেন আবেগোৎসারিত ভাষায়। জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চায় নবপ্রজন্মকে বিশ্বজোড়া প্রতিযোগিতার আহ্বান জানাতেন। সর্বোপরি তিনি ছিলেন জাতির দরদী বক্তা। দরদী মালি। নিজের আখের গোছাতে বক্তৃতা করতেন না।। তিনিই সম্ভবত একক ব‍্যক্তি যিনি সুদীর্ঘ কাল ধরে দাওয়াতী ময়দানে বিচরণ করেছেন সফলভাবে। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে। তাঁর অনুষ্ঠানে উপচে পড়া ভিড় পরিলক্ষিত হত। তাঁর সময়োপযোগী বক্তব্য বরাক ব্রহ্মপুত্রের শীর্ষ স্থানীয় সংবাদপত্রে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করতো। প্রায় প্রতিদিন বরাকের সিংহভাগ পত্রিকায় তাঁর ভাষণের নির্বাচিত অংশ বড় বড় হরফে ছাপা হতো। এতে তাঁর গ্রহনযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা গগনচুম্বী হয়েছিল। সুশীল সমাজ তাকে চেনতে পেরেছিল। মূল্যায়নের সুযোগ পেয়েছিল।

তিনি ছিলেন জাতীয় পর্যায়ের বেশ কয়েকটি সংগঠনের সদস্য। বিভিন্ন সময় যোগ দিতেন সংগঠনগুলোর কনভেনশনে। রাখতেন নতাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য। তাঁর জ্ঞানগর্ভ আলোচনা মনীষীগণের নজর কাড়ত। পার্সোনাল লো বোর্ডের প্রকাশ‍্য অধিবেশনে হয়রতের ভাষণ থাকত নিয়মিত। তাঁর সময়োচিত যথোপযুক্ত বয়ান বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় স্থান পেত। ফিকহ সেমিনার,মুজলিসে মুশাওয়ারাত ও মিল্লী কাউন্সিলের অধিবেশনগুলোতে হয়রতের তাত্ত্বিক আলোচনা বিদ্বজনের প্রশংসা কুড়ত।

তাঁর নির্বাচিত বক্তব্য পুস্তিক আকারে প্রকাশিত হয়েছিল, খুতবাতে আমীরে শরীয়ত নামে। বইটি পড়লে অনুভূত হয় যে, তিনি ছিলেন সত্যিকারের বক্তা। সফল বক্তা আলোড়ন সৃষ্টিকারী যুগশ্রেষ্ঠ ওয়াইজ। কয়েক দশক জোড়া বয়ানে ধর্মীয় ও সামাজিক সবকটি বিষয় স্থান পেয়েছিল। প্রয়োজনীয় সব বিষয়ে কথা বলেছিলেন উম্মাহর প্রতি দরদভরা কন্ঠে। তিনি হক কথা বলতেন নির্দ্ধিধায়। নির্ভয়ে। কারও সমালোচনা ও ভর্ৎসনার তোয়াক্কা করতেন না। মোটেই। তিনি বিদায়াত কুসংস্কার নিয়ে ছিলেন আপোষহীন। বিদায়াত ও কুসংস্কারের মূলোৎপাটনে ছিলেন সরব। সোচ্চার। সমাজকে বিদায়াতের বিষাক্ত ছোবল থেকে বাঁচাতে ছিলেন সদাতৎপর। সিংহভাগ ভাষণে বিদায়াত ও কুসংস্কার নির্মূলের আবেদন করতেন আবেগঘন ভাষায় ।

আমীরে শরীয়ত সাহেবের অসংখ্য গুণগ্রাহী ছিলেন বাংলাদেশে। সেই ১৯৯০ থেকে বাংলাদেশ সফর থাকত নিয়মিত। সেখানে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করতেন। রাখতেন ভাষণ। তাঁর মুখে ঝরতো ইলম ও জ্ঞানের মনি মুক্তা। তাঁর মুগ্ধতা ছড়ানো বয়ানে আমজনতা আকর্ষিত হত। তাঁর হাঁটা পথকে নিজের পাথেয় হিসেবে বেছে নিত । তাঁর বয়ানে থাকত না সমার্থক শব্দের প্রাচুর্য। থাকত না আগুন ঝরানো কোন উস্কানি। না থাকত মানুষ ভিড়ানোর কোনও কলা কৌশল। কিন্তু থাকত তথ্য ও তত্ত্বের প্রাধান্য।থাকত চিন্তা চেতনার উপাদান, সঠিক পথ ও মতের দিক নির্দেশনা। তাঁর না ছিল আশ্চর্য রকমের সুর ও ভঙ্গিমা। তবুও মানুষ তাঁর বয়ান শুনতে পাগলের মত ছুটে আসত।

যুগটা ছিল সুর ও ভঙ্গিমার। এ দুটি আছে যার, তিনি এ ময়দানে সফল। এ ক্ষেত্রে হযরতের স্থান শূন্যের কোঠায়। তবুও ছিল লাখো জনতার প্রিয় বক্তা। চাহিদা ছিল তাঁর বক্তব্যের । কতশত মানুষ তাঁর কাছে ওয়াজের দাওয়াত নিয়ে খালি হাতে ফিরে এসেছেন একমাত্র সময় সংকুলানের অভাবে। হযরতের সহজ সরল বক্তব্যে মানুষ আন্দোলিত হত। প্রশান্তির সাগরে সাঁতার কাটত। জ্ঞান জগতে বিচরণ করত। আধ‍্যাত্মিকতার নীল আকাশে উড়ে বেড়াত। উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার সাগরে ডুব দিত। মোদ্দা কথা তাঁর বক্তব্যে কী যাদু ছিল তা যথাযথভাবে বর্ণনা করা আমার সাধ‍্যাতীত। যারা তাঁর বয়ান শুনার সৌভাগ্য হাসিল করেছেন, তারাই একমাত্র অনুধাবন করতে পারবেন।

Rashid Qasimi

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top