Home » বিস্মৃতপ্রায় ভাষা সেনানী আব্দুর রহমান চৌধুরী।

বিস্মৃতপ্রায় ভাষা সেনানী আব্দুর রহমান চৌধুরী।

Advertisements In Feed
Advertisements

ভাষা আন্দোলন বরাকের ঐতিহাসিক রক্তস্নাত আন্দোলন। হিন্দু মুসলিম ঐক্যের আন্দোলন। অধিকার ছিনিয়ে আনার আন্দোলন। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় বরাকের আমজনতা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এই আন্দোলনে। একষট্টির ভাষা আন্দোলনের সেনাপতি ছিলেন বিস্মৃতির অতল তলে তলিয়ে যাওয়া আব্দুর রহমান চৌধুরী। তাঁর সুযোগ্য ব্যক্তিত্ব ও সুদৃঢ় নেতৃত্বে একষট্টির ভাষা সংগ্রাম সফলতার শিখরে পৌঁছেছিল। বাঙালিরা মাতৃভাষার অধিকার ছিনিয়ে এনেছিল।

১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের ২১ ও ২২ এপ্রিল । আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির এক সভায় অসমীয়া ভাষাকে আসামের একমাত্র সরকারি ভাষার মর্যাদা প্রদানের প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। বরাকের সদস্যগণ প্রস্তাবটির তীব্র বিরোধিতা করেন। তাদের বিরোধিতা ধোপে টেকেনি।
৭ মে শিলচর পৌরসভা কক্ষে জননেতা আব্দুল মতলিব মজুমদারের সভাপতিত্বে কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি জেলা কংগ্রেস কমিটির এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ভাষা বিল নিয়ে আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানানো হয় । ৭ জুন শিলচর নরসিংহ টোলায় সাংসদ শ্রী দ্বারিকানাথ তেওয়ারির নেতৃত্বে নিখিল “আসাম বাঙ্গালা ভাষা সম্মেলন” এর প্রস্তুতি কমিটির আহ্বানে এক জনসভা আয়োজন করে। প্রস্তাবিত এই সম্মেলনকে সাফল্য মণ্ডিত করতে জনগণের সহযোগিতা কামনা করে একটি আবেদনপত্র প্রচারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ আবেদনপত্রে অন্যতম স্বাক্ষরকারী ছিলেন আব্দুর রহমান চৌধুরী।

১০ ডিসেম্বর তৎকালীন আসা মের মুখ্যমন্ত্রী শ্রী বিমলা প্রসাদ চলিহা বিধানসভায় আসাম সরকারী ভাষাবিল পেশ করেছিলেন। ভাষা বিলে অসমীয়া ভাষাকে একমাত্র সরকারি ভাষার মার্যাদা প্রদান করা হয়েছিল। ২৪ ডিসেম্বর ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে সকল অনুরোধ‌ ও আবেদন নিবেদনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একমাত্র সংখ্যার জোরে ভাষা বিল পাশ করা হয় । এদিন ভাষা বিলের প্রতিবাদ করে ‌উপজাতি ও বরাকের বিধায়কগণ সদন ত্যাগ করেন। প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও ১৭ ডিসেম্বর সরকারি ভাষা বিলে শিলমোহর দেন রাজ্যপাল। ফলে বিলটি আইনে রূপান্তরিত হল।
এতে সমগ্র রাজ্য জুড়ে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি সৃষ্টি হল। মাতৃভাষা প্রেমে উজ্জীবিত হয়ে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাঙালিরা। উগ্র অসমীয়া জাতীয়তাবাদী আগ্রাসন প্রতিরোধে ধারাবাহিক সংগ্রামী কার্যসূচি গ্রহণের জন্য ১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি করিমগঞ্জ টাউন ব্যাঙ্ক প্রাঙ্গণে হাইলাকান্দি লোকেল বোর্ডের চেয়ারম্যান আইনজীব আব্দুর রহমান চৌধুরীর সভাপতিত্বে জনসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে কাছাড় করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি থেকে সদস্য নিয়ে গঠন করা সংগ্রাম পরিষদ । ৮ ফেব্রুয়ারি হাইলাকান্দিতে সংগ্রাম পরিষদের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় সংগ্রাম পরিষদের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়। এদিন সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন আইনজীবী আব্দুর রহমান চৌধুরী। সম্পাদক মনোনীত হন নলিনীকান্ত দাস।

এবার সংগ্রাম পরিষদ শুরু করে তীব্র আন্দোলন। বরাকের গ্রাম শহরে শুরু করে মিটিং মিছিল। আমজনতাকে মাতৃভাষা প্রেমে উজ্জীবিত করে ভাষা আইনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এসময় সংগ্রাম পরিষদের আইনজীবী সভাপতি আব্দুর রহমান চৌধুরী বরাক উপত্যকার গ্রাম শহরের প্রান্তে প্রান্তে চষে বেড়ান। তাঁর উৎসাহ ও প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে আবাল বৃদ্ধ বনিতা ভাষা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। ভাষা আন্দোলনের সেনানী নীতা দাসের ভাষায়,ভাষা আন্দোলনের সফল নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আব্দুর রহমান চৌধুরী। তাঁর পরিচালনায় আপামর জনসাধারণ সহ ছাত্র সমাজ সংগঠিত হয়। উদ্বুদ্ধ হয় মাতৃভাষার অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায়। ভাষা আন্দোলনের (হাইলাকান্দি) মিছিলগুলো তাঁর বাড়ি থেকে শুরু হত। আবার তাঁর বাড়িতেই শেষ হত। মিছিলের অগ্রভাগে থাকতেন লৌহ পুরুষ আব্দুর রহমান চৌধুরী। ম্যাসব্যাপি চলে মিটিং মিছিল। ছাত্ররা কারাবরণ করে। তিনি ছাত্রদের সবসময় মদত যোগাতেন।

এভাবে বাংলা ভাষার অধিকার আদায়ের সংগ্রামের প্রস্তুতি যখন পূর্ণোদ্যমে চলছিল,জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে গোটা বরাকবাসী ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রামে ঝাঁপাচ্ছিল, তখন আসাম সরকার শান্তি পরিষদ গঠন করল। শান্তি পরিষদ ও প্রশাসনের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগিয়ে ভাষা আন্দোলনকে অন্য মোড় দিতে চাইলো ‌। আইনজীবী আব্দুর রহমান চৌধুরী ও মওলানা জলীল চৌধুরী শান্তি পরিষদের মুখোশ উন্মোচন করলেন। সরকারের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আমজনতাকে ওয়াকিবহাল করলেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ন রাখতে তাঁর এই নিরলস প্রচেষ্টা বরাকের ইতিহাসে জাজ্বল্যমান থাকবে

দীর্ঘকালীন ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১০ মে ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে কুখ্যাত রাজ্যভাষা আইনের প্রতিরোধে তিনদল পদযাত্রী হাইলাকান্দি মহকুমার গ্রামেগঞ্জে পদযাত্রা শুরু করেছিল। তিনটি দলে শতাধিক পদযাত্রী ছিলেন। এতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আব্দুর রহমান চৌধুরী, কেশবচন্দ্র চক্রবর্তী ও হরিদাস দেব প্রমুখ। ১৯ মে শিলচরে রেল স্টেশনে ভাষা সত্যাগ্রহীদের উপর পুলিশ গুলি চালায়। আসাম পুলিশের বেপরোয়া গুলি এগারোটি তরতাজা প্রাণ কেড়ে নেয়। এবার পরিস্থিতি আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে। বাঙালিরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে। অবস্থা বেগতিক দেখে কেন্দ্র সরকারের নড়চড়ে বসে । প্রধানমন্ত্রী নেহেরু কেন্দ্রীয় গৃহমন্ত্রী শ্রীলাল বাহাদুর শাস্ত্রীকে ভাষা আন্দোলন প্রেক্ষাপট, গুলি চালনার রহস্য ও এর সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে শিলচর পাঠান। শাস্ত্রীজী সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক করেন। এতে নেতৃত্ব দেন আব্দুর রহমান চৌধুরী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংগ্রাম পরিষদের এক প্রতিনিধিদলকে দিল্লিতে আমন্ত্রণ জানান। ২ ও ৩ জুলাই দিল্লিতে সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আলোচনায় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন আব্দুর রহমান চৌধুরী। বৈঠক শেষে গৃহমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন স্মারকপত্র। মূল স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেন সংগ্রামী নেতা আবদুর রহমান চৌধুরী।
১৯ জুন হাইলাকান্দিতে ঘটে গেল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। দাঙ্গায় পুলিশের গুলিতে দশজন প্রাণ হারালেন। দশটি লাশের শেষকৃত্য করতে কেউ এগিয়ে আসল না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর প্রশাসন অবশেষে আব্দুর রহমান চৌধুরীকে অনুরোধ করল। প্রশাসনের অনুরোধে সাড়া দিয়ে তিনি মৃতদেহগুলোর সৎকার করেছিলেন।

নবপ্রজন্মের বাঙালিরা এই লড়াকু ভাষা সৈনিকের দান অবদান সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়। তারা জানে না কে ছিলেন আব্দুর রহমান চৌধুরী? কী ছিল তাঁর অবদান। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় তিনি কী করেছিলেন? কতটা ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল এ বীর বাঙালিকে? যেটা সত্যিই পরিতাপের বিষয়। যাদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও জীবনপণ সংগ্রামে মাতৃভাষা বাংলার অধিকার সাব্যস্ত হয়েছে। তাঁদেরকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করা আবশ্যক।
মুফতি রশিদ আহমদ কাসিমী
উপাধ্যক্ষ দারুল উলুম বদরপুর।

Rashid Qasimi

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top