Home » মহরঃ নারীর মর্যাদার এক অনুপম দৃষ্টান্ত।

মহরঃ নারীর মর্যাদার এক অনুপম দৃষ্টান্ত।

Advertisements In Feed
Advertisements

ইসলামই একমাত্র ধর্ম যেখানে নারীকে যথাযোগ্য মর্যাদা ও সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে। প্রদান করা হয়েছে তাদের যথাযথ অধিকার। নারী জাতিকে ইসলাম যেসব মাধ্যমে সম্মানিত করেছে তার অন্যতম মোহর। মোহর হল বিবাহ সন্ধিক্ষণে বর পক্ষ থেকে কনকে উপহার স্বরূপ প্রদত্ত অর্থরাশি বা সম্পদ। এটা প্রদান করা আবশ্যক। পৃথিবীর কোন ধর্ম বিবাহে স্বামীর উপর কোন ধরনের উপঢৌকণ বা উপহার প্রদান আবশ্যক করেনি। ইসলামই ব্যতিক্রমী ধর্ম যেখানে বিবাহে বরের উপর মোহর( উপঢৌকন) দেওয়া আবশ্যক করেছে। নারীর সুরক্ষা,সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মোহর আবশ্যক করা হয়েছে। মূলত মোহর একটি সম্মাননা। কোন বস্তু সহজে এবং এমনিতেই পাওয়া গেলে সেটার কোন আলাদা গুরুত্ব ও বিশেষ মর্যাদা থাকে না। অন্যদিকে অর্থ সম্পদ ব্যয় করে কোন কিছু অর্জন করলে এটার গুরুত্ব থাকে। বস্তুত হরেক কষ্টার্জিত বস্তুর আলাদা মর্যাদা থাকে। মহর আবশ্যক না হলে মানুষ যখন তখন বিয়ে করতো। পান থেকে চুন খসলেই তালাক দিতো। আর এতেই বিবাহের উদ্দেশ্য ব্যাহত হতো। সমাজে বিবাহিত মহিলাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেত। ভ্যবিচারের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তো। বিশৃঙ্খলা দেখা দিতো সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। তাছাড়া নারীকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করতে মোহর আবশ্যক করা হয়েছে। কোন কারণবশত যদি বিবাহ ভঙ্গ হয়ে যায়,তাহলে একজন মহিলা পরবর্তী বিবাহ পর্যন্ত কিংবা পরবর্তী জীবন সসম্মানে যাপিত করতে পারে সেটার সুব্যবস্থা করতেই মোহর ধার্য করা হয়েছে। তাছাড়া কোন স্বামী ভরণ পোষণ প্রদানে অক্ষম হলে স্ত্রী নিজের ভরণ পোষণ ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে মোহরানার অর্থ ব্যয় করে সুষ্ঠুভাবে জীবন যাপন করতে পারবে।

বিবাহের পর একজন নারী স্বামীর কাছে তার সর্বস্ব সপোর্দ করে দেয়। যেটা সত্যিই এক মহাদান। সেই মহা দানের প্রতিদানে কৃতজ্ঞতা স্বরূপ মোহর দেওয়া হয়। মহর আবশ্যক করে ইসলাম সূক্ষ্মভাবে আঙুলি নির্দেশ করেছে যে, বিবাহে কনের পক্ষ থেকে কোনও অর্থ রাশি ও মাল আসবাব প্রদান করা হবে না। বরং কনেকে মহরের মাধ্যমে অর্থরাশি বা সম্পদ উপঢোকন দেওয়া হবে।

মহান আল্লাহ তায়ালা নারী জাতির সম্মান প্রদর্শন করে ঘোষণা করেন,আর তোমাদের স্ত্রীদের তাদের মোহর দিয়ে দাও খুশি মনে । (সূরা নিসা ৪)
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,হে নবী আমি তোমার জন্য বৈধ করেছি তোমার স্ত্রীদেরকে,যাদের দেন মোহর তুমি দান করেছ।( সূরা আহজাব ৫০)

মহানবী সাঃ নিজে মহর প্রদান করে উম্মতকে মহর প্রদানে উৎসাহিত করেছেন। তাছাড়া তাঁর তনয়াদের মহর গ্রহন করে এর গুরুত্ব প্রমাণিত করেছেন।
হযরত জাবির রাঃ থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাঃ এরশাদ করেছেন দশ দিরহাম থেকে কম মহর নেই।
হযরত ইবনে উমর রাঃ থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,সহজ মহরই উত্তম মহর।

মোহর আমাদের সমাজে একটা চূড়ান্ত উপেক্ষিত ধর্মীয়নীতি। কেউ কেউ মনে করেন,মোহর একটা কাল্পনিক দায়িত্ব। এটা শুধু নির্ধারণ করলেই চলে। আদায় করা আবশ্যক নয়।‌ সমাজে এমন বর সাহেব আছেন, যিনি বিবাহ দিবসে দুয়েকবার কাজি সাহেবের মুখে মোহরানার পরিমাণ শুনেছেন । এরপর আদায় তো দূর কি বাত, জীবনে ভুলেও মোহর শব্দটি মুখে আনতে চান নি। সারাটা জীবন স্ত্রীর সঙ্গে সুখের সংসার করলেও মোহর আদায়ের প্রয়োজনীয়তা বোধ করেননি। অথচ কোরআন হাদিসের আলোকে মোহর আদায় করা আবশ্যক। কেউ যদি আদায় না করেন তাহলে গোনাহগার হবেন নিঃসন্দেহে। এবং এটা আদায়ের দায়িত্ব কাঁধে তার থেকেই যাবে।

আমাদের সমাজে একটা ভয়ংকর মনোভাব তৈরি হচ্ছে যে, মোহরানার পরিমাণ ধার্য করলেই কেল্লাফতে। আদায় আর করতে হয় না। ফলে
বিবাহ সন্ধক্ষণি মানুষ যাচ্ছেতাই মোহর নির্ধারণ করে বসে। নিজেদের প্রভাব ও দাপট প্রদর্শনে মোটা অংকের মোহর প্রদানে সম্মত হয়ে যান। তারা ভাবেন,
মোহর একটা প্রতীকি নীতি। অংকটা যাই লেখা হোক না কেন আদায় তো আর করতে হবে না। তাছাড়া কেউ কেউ ভাবেন, মহরের সম্পর্ক তালাকের সাথে। তালাক দিলে মোহর আদায় করতে হয়। অন্যতায় আদায় না করলে চলে। তাই বড় অঙ্কের মোহর ধার্য করতে তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে না। অথচ ইসলাম মোহরকে সর্বাবস্থায় আবশ্যক করেছে।

মহরের সর্বনিম্ন পরিমাণ দশ দিরহাম। যেটার বর্তমান ওজন দুই তোলা ৬১৮ মিলিগ্রাম। এরচেয়ে কম পরিমাণের মহর হতেই পারে না। বর পক্ষ যতই গরীব ও অসহায় হোক। এই পরিমাণ মোহর আদায় করতেই হবে।
ইসলামী নীতিমালা কী চমৎকার। কী অপূর্ব। ইসলাম ভারসাম্যপূর্ণ একটা ধর্ম। মানুষের শ্রেণীভেদে দিয়েছেন আলাদা আলাদা নীতিমালা। যাতে কারো উপর কষ্ট না হয়। সমাজের দরিদ্র সীমার নীচের শ্রেণীর জন্য নির্ধারণ করেছে একটি সংখ্যা। আবার মধ্যবৃত্ত শ্রেণীর জন্য নির্ধারিত করেছে অন্য সংখ্যা। অন্যদিকে ধনাট্য ও অভিজাত পরিবারের মানুষের জন্য রয়েছে অন্য অংক। যাতে প্রত্যেকে নিজ নিজ সম্মান, মর্যাদা এবং পারিবারিক পরম্পরা ও আভিজাত্য বজায় রেখে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে । এজন্য ইসলাম মোহরের সর্বনিম্ন পরিমাণ ধার্য করে দিয়েছে। কিন্তু সর্বোচ্চ কোন পরিমাণ ধার্য করেনি। আর এতেই রয়েছে সহজতা। তবে হ্যাঃ এক্ষেত্রে মহানবী সাঃ এর সুন্নাত রয়েছে। যে কেউ সেটার অনুসরণ করে সাওয়াব লাভ করতে পারেন।
মহানবী সাঃ এবং সাহাবাদের সুন্নত থেকে চার প্রকারের মোহর প্রমাণিত হয়। তবে কেউ এই চারটি ব্যতিত নিজের সুবিধার জন্য অন্য কোন পরিমাণ ধার্য করেন তাহলে সেটা জায়েজ হবে। এক্ষেত্রে কোন বাধ্যকতা নেই।

ইসলাম একটি সুসংহত নীতিমালার সমষ্টি। ইসলামের অনুসারীরা যাতে সহজ এবং নির্ভেজাল জীবন যাপন করতে পারে,অযথা কষ্ট আর জটিলতার পাহাড় মাড়াতে না হয় সেটার সুব্যবস্থা রেখেছে। রেখেছে এমন সব নীতিমালা যেগুলো সহজে পালন করা একেবারেই সহজ।
মোহরকে চারটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছে। যাতে কারো উপর চাপ সৃষ্টি না হয়। আবার কারো মর্যাদায় আঘাত না আসে।

এক,মহরে উম্মে সালমাঃ এই মহরের পরিমাণ দশ দিরহাম। অর্থাৎ দুই তোলা ৬১৮ মিলিগ্রাম রোপার মূল্য। এটাই সর্বনিম্ন পরিমাণ মোহর। এর নীচে মোহরানার কোনও পরিমাণ নেই। মূলত এটা সমাজের গরীব দুঃখী দুর্বল শ্রেণীর জন্য। ইসলাম ভারসাম্যপূর্ণ ধর্ম। সমাজের সব শ্রেনীর মানুষের কথা চিন্তা করে ধার্য করেছে একেকটি পরিমাণ। আর এটাই সবচেয়ে বড় সুন্দর্য। যাতে মানুষ সহজে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে। মোহরানার অসহায়দের বিবাহে পথের কাঁটা না হয়। হিদায়া ২ খণ্ড ৩২৪ পৃষ্ঠা।।

ফাতিমী মহরঃ ফাতিমী মহরের পরিমাণ পাঁচশত দিরহাম। যেটার বর্তমান ওজন ১৫১ তোলা ৯০০ মিলিগ্রাম। হুজুর সাঃ তাঁর স্ত্রীগণের সিংহভাগকে এই মোহর প্রদান করেছেন। তাছাড়া তনয়াদের ক্ষেত্রে এই মোহর গ্রহন করেছেন। এই মোহর ছিল ফাতিমা রাহঃ এর। তাঁর নামে এটা প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এই মোহরানা সমাজের মধ্যবৃত্ত শ্রেণীর জন্য আদায় করা সহজ। মুসলিম ৪৫৮/১

মহরে উম্মে হাবিবাঃ এই মহরের পরিমাণ চার হাজার দিরহাম। এটা ফাতিমী মহরের আট গুণ বেশি। ঐ মহর সমাজের উচ্চবিত্ত ও আর্থিকভাবে স্বচ্ছল পুরুষদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ঐ পরিমাণ টাকা আদায় করা যাদের জন্য কষ্টকর হবে না। তাছাড়া এটা তারজন্য সুন্নতসম্মত ও শরীয়ত সম্মত হবে।
হযরত উম্মে হাবিবা রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি ছিলেন উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাসের স্ত্রী। তিনি হাবশায় মৃত্যূবরণ করেছিলেন। তখন হাবশের বাদশা নাজ্জাশি তাঁকে হুজুর সাঃ এর সাথে বিবাহ দিলেন। এবং তাঁর পক্ষ থেকে চার হাজার দিরহাম মহর আদায় করলেন। (আবু দাউদ)

মহরে উম্মে কুলসুমঃ এই মহরের পরিমাণ চল্লিশ হাজার দিরহাম। এটা ফাতিমী মহরের আশি গুণ বেশি। মহরে উম্মে কুলসুম সমাজের ধনাঢ্য ও ধনকুবেরদের জন্য। যাদের আর্থিক অবস্থা এতটা উন্নত, যে তারা সহজে এই পরিমাণ অর্থরাশি আদায় করতে পারবে। এটা আদায়ে তাদের কোন কষ্ট হবে না। এই মোটা অংকের মোহর আদায় তাদের জন্য সুন্নতসম্মত ও শরীয়ত সম্মত হবে। এই বিরাট অংকের মোহর হযরত আলী রাহঃ এর তনয়া উম্মে কুলসুমকে দিয়েছিলেন হযরত উমর রাঃ।( বায়হাকি)

মহর সংক্রান্ত কয়েকটি মাসআলাঃ মহর প্রদানকালে স্বামী নির্ধারিত মহর থেকে বেশি দিতে পারবে। (শামি)

  • মহর গ্রহনকালে কনে চাইলে নির্ধারিত অর্থরাশি থেকে কম গ্রহন করতে পারবে। (হিদায়া)

*স্বামীর মৃত্যুর পর মোহর অনাদায় থাকলে মিরাসের ভাগ বাটুরার আগে স্ত্রীর মহর আদায় করা ওয়াজিব। (হিদায়া)
*যদি কোন স্ত্রী মহর মাফ করে দেন তাহলে জায়েজ হবে।(হিদায়া)
*মহর মাফ করার জন্য স্বামী স্ত্রী উপর বলপ্রয়োগ করলে মহর মাফ হবে না।

*মহর আদায় করা হয়নি এমতাবস্থায় স্ত্রী মারা গেলে শরীয়ত সম্মত ওয়ারিসগণ মহরের মালিক হবেন।

মুফতি রশিদ আহমদ কাসিমী, উপাধ্যক্ষ দারুল উলুম বদরপুর।

Rashid Qasimi

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top