Home » মাওলানা হুসাইন আহমদ লস্কর (কারি হুজুর) স্মরণে…

মাওলানা হুসাইন আহমদ লস্কর (কারি হুজুর) স্মরণে…

Advertisements In Feed
Advertisements

মানুষ মরণশীল। জন্মালে মরতেই হয়। মৃত্যূর স্বাদ গ্রহন করতে হয় হরেক প্রাণীকেই। মৃত্যূর এই ধারাবাহিকতায় প্রতিদিন কত মানুষ চলে যায় না ফেরার দেশে। কেউ রাখে না কারও খবর । কেউ করে না কাউকে স্মরণ। কিন্তু এ ধরায় এমনও কিছু সৌভাগ্যবান মানুষ পাওয়া যায়,যারা মরেও থাকেন অমর; থাকেন মানুষের স্মৃতিপটে চিরভাস্বর। যুগ যুগ ধরে বেচেঁ থাকেন মানুষের হৃদয়ে। মানুষ তাঁদেরকে ভুলতে চাইলেও পারে না বিস্মৃত হতে। তাঁরা আপন আপন কীর্তিতে ভেসে উঠেন সবার স্মৃতির পর্দায়। এমনি এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন আলজামিয়াতুল আরাবিয়াতুল ইসলামীয়ার প্রাক্তন শিক্ষক কারি মাওলানা হুসাইন আহমদ লস্কর রাহঃ।

তিনি ছিলেন আলজামিয়ার কিরাত ও তাজওয়ীদ বিষয়ক শিক্ষক । ফলে কারী হুজুর হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন আলজামিয়া সহ গোটা বদরপুরে। তাঁর তিলাওয়াত ছিল মুগ্ধকর। পাঠদানশৈলী ছিল বেশ চমৎকার এবং ব্যতিক্রমী। ক্লাস সর্বদা থাকত প্রাণবন্ত । হুজুরের ক্লাস শুধু পাঠদানে সীমাবদ্ধ থাকতো তা নয়। বরং জীবন পথের বাঁকে বাকেঁ যেসব সমস্যা এসে হাজির হয় সেসব বিষয়ে তিনি ছাত্রদের ওয়াকিবহাল করতেন। গল্পের ছলে বিভিন্ন বিষয়ে ছাত্রদের সচেতন করতেন। তারঁ দরস কখনও বিরক্তিকর হত না। আশ্চর্য একটা ভঙ্গিতে পাঠদানে অভ্যস্ত ছিলেন কারি হুজুর । তাঁর বিষয় কিরাত ও তাজওয়ীদে চূড়ান্ত পরীক্ষায় ছাত্রদের পারফরম্যান্স বেশ নজরকাড়া থাকত। উত্তর পূর্ব ভারতের সুবিখ্যাত ইসলামী শিক্ষা পীঠস্থান দেওরাইল টাইটেলে দীর্ঘ সময় ধরে পাঠদানের সুবাদে হুজুরের ছাত্র সংখ্যা কয়েক হাজার ছুঁয়েছিল। উত্তর পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর অসংখ্য ছাত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। বিভিন্ন স্কুল কলেজ মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত আছেন তাঁর বহু ছাত্র। তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্নেহবৎসল। ছাত্রদের সাথে সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ। সুটাম সুন্দর দীর্ঘদেহী এই মানুষটি ছিলেন ছাত্রদের খুবই কাছের। অত্যন্ত প্রিয়। ছাত্রদের উৎসাহ প্রদানে ছিলেন বেশ তৎপর । সুন্দর সুন্দর বাক্যে আশাব্যঞ্জক কথামালায় উৎসাহ প্রদান করতেন ছাত্রদের। বহুদূর এগিয়ে যেতে সাহস যোগাতেন। এ কলমচীকেও বারবার উৎসাহিত করেছেন বাছা বাছা বাক্যে। আবার নীতি বহির্ভূত কোন কাজ দেখলে ধমক দিতেন। রাগে অগ্নীশর্মা হতেন। তাঁর ধমকেও ছিল শিক্ষা। ধমক দিয়ে কাছে টেনে নিতেন। স্নেহের পরশ বুলিয়ে হাতে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিতেন ধমক দেওয়ার কারণ।

কারী হুজুর ছিলেন গ্রাম্য বিচারক। সপ্তাহে একদিন গ্রামের বাড়িতে থাকতেন। আর এই দিনটা কাটতো বিচারসভায়। একের পর এক বচারসভায় সালিসী করতেন। তিনি ছিলেন সফল ও প্রজ্ঞাবান বচারক। কাছাড় গণিরগ্রাম এলাকায় তাঁর বিচারের একটা নাম ডাক ছিল। ছিল বদরপুর এলাকায় হুজুরের সালিসীর যশখ্যাতি। বড় বড় সমস্যার সমাধান করতেন অত্যন্ত দূরদর্শীতার সাথে। জটিল মামলার ফয়সালা শুনাতেন বিজ্ঞোচিত কন্ঠে।

১৯৫৩ সালের ০৩ জানুয়ারি কাছাড় জেলার গণিরগ্রাম নক্তীরগ্রামে জন্ম গ্রহন করেন বিখ্যাত এই কারী সাহেব। তাঁর বাবার নাম ছিল হাজী কলমদর আলী লস্কর। মাতার নাম ছিল আজিদা বিবি লস্কর।

মাওলানা হুসাইন আহমদ লস্কর সাহেবের পড়াশুনার হাতেখড়ি হয় গ্রামের ছবাহী মক্তবে। ছবাহী মক্তবে ইসলামী প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি গ্রামের পাঠশালায় ভর্তি হন। এরপর যাত্রা করেন ঐতিহ্যবাহী দারুল উলুম বাশকান্দী মাদ্রাসায়। এখানে দেওরায় হাদিস (এরাবিক চূড়ান্ত বর্ষ) পর্যন্ত পড়াশুনা করেন। উল্লেখ্য, বাঁশকান্দি থাকাকালে তিনি ছিলেন বিশিষ্ট আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হযরত মাওলানা আহমদ আলী বাশকান্দি রাহঃ এর বিশেষ সেবক। কুরআন শরীফের বিশুদ্ধ তিলাওয়াত ও তাজওয়ীদের জ্ঞান অর্জন করার লক্ষে হাইলাকান্দি কুছিলা কারিয়ানা মাদ্রাসায় ভর্তি হন। অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে সেখানে পড়াশোনা করেন। এরপর ঐ মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে নিযুক্তি লাভ করেন। শিক্ষকতা করেন কয়েক বছর। অতঃপর আসামের প্রাচীন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় আসাম দারুল হাদিস জয়নগর মাদ্রাসায় শিক্ষকতায় যোগ দেন। এখানে কিছুদিন শিক্ষকতার পর হাইলাকান্দির আশরাফুল উলুম রতনপুর টাইটেল মাদ্রাসায় যোগ দেন। কয়েক বছর শিক্ষকতা করেন যোগ্যতার সাথে। এরপর ১৯৪৮ সালের শেষের দিকে সেখান থেকে চলে আসেন।

মাওলানা লস্কর সাহেবের তিলাওয়াত ছিল অত্যন্ত সুমিষ্ট। তাঁর হৃদয়স্পর্শী অসাধারণ তিলাওয়াত শুনলে যে কেউ মুগ্ধ হতেন। অভিভূত হতেন। তাছাড়া তাজওয়ীদ জ্ঞানও ছিল বেশ গভীর। এসব অসাধারণ গুণাবলির খবর পেয়ে হযরত মাওলানা আব্দুল জলিল চৌধুরী সাহেব তাঁকে ডেকে পাঠালেন। ২৭ ডিসেম্বর ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে সাক্ষাৎকার গ্রহন করলেন। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে বিমুগ্ধ হয়ে নিযুক্তি প্রদান করলেন। অবশেষে পয়লা জানুয়ারি ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে মাওলানা হুসাইন আহমদ লস্কর রাহঃ আলজামিয়াতুল আরাবিয়াতুল ইসলামীয়ায় শিক্ষকতায় যোগ দেন। জীবনের বসন্ত কাল এখানে বিশুদ্ধ কুরআন তিলাওয়াত‌‌ ও তাজওয়ীদের পাঠদানে কাটিয়েছেন কারি হুজুর। অবশেষে ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। অবসর গ্রহণের পর বসে থাকেন নি এই শিক্ষা প্রেমী ব্যক্তিটি। বুড়িবাইল ইসলামীয়া মাদ্রাসায় মুহতামিম হিসেবে কার্যভার গ্রহণ করেন। বছর খানেক এখানকার দায়িত্ব সামলান। এরপর ব্যক্তিগত অসুবিধায় অবসর গ্রহণ করেন।

মাওলানা হুসাইন আহমদ লস্কর ছিলেন প্রথম আমীরে শরীয়ত হযরত মাওলানা আব্দুল জলিল চৌধুরী রাহঃ এর খুবই প্রিয়পাত্র। তিনি বাশকান্দি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে সেখানকার রূপকার হযরত মাওলানা আহমদ আলী রাহঃ এর বিশেষ খাদিম হওয়া সত্ত্বেও আধ্যাত্মিকতার পাঠ নিয়েছিলেন মাওলানা আব্দুল জলিল চৌধুরী রাহঃ এর কাছে । হযরত বদরপুরী তাঁকে খতমে ঐতিহ্যবাহী বোখারীর মাহফিলে এশার নামাজের ইমামতির দায়িত্ব স্থায়ীভাবে অর্পণ করে সম্মানিত করেছিলেন। অবসর গ্রহণের পর প্রতি বছর খতমে বোখারী উপলক্ষে আলজামিয়া আসতেন প্রিয় হুজুর। তখন ছাত্ররা প্রাণপ্রিয় হুজুরের সাথে সাক্ষাতে ছুটে যেত। আমিও বারবার সাক্ষাতে ছুটে গেছি। মাদ্রাসার কার্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলেছি। সে চিত্র আজ বড্ড কাঁদায়।

গত কয়েক বছর ধরে লিভার জনিত রোগে ভোগছিলেন তিনি। দীর্ঘ রোগ ভোগের সময় বারবার ছুটে গেছি হুজুরের বাড়িতে। সহাস্য বদনে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। আপ্যায়ন করেছেন। খুশি হয়েছেন। পাশে বসিয়ে কত কথা বলেছেন। কত গল্পের জাল বুনেছেন। তিনি ছিলেন দৈনিক সাময়িক প্রসঙ্গের পাঠক। আর আমি মাঝেমধ্যে সাময়িক প্রসঙ্গে লেখালেখি করি। আমার লেখা পড়ে হুজুর খুশি হতেন। বাড়ি গেলে বলতেন,রশিদ তোমার লেখা পড়ি, ভালো লাগে আরও লেখো…। হুজুর সম্পর্কিত আরও কত স্মৃতি আজ ভেসে উঠছে স্মৃতিপটে।

গত ছয় জুন রাত এগারোটা ত্রিশ নাগাদ সুপ্রসিদ্ধ এই কারী সাহেব পরপারে পাড়ি জমান। হুজুরের পরকালীন শান্তি কামনা করছি।

Rashid Qasimi

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top