Home » শবে ক্বদর: মহিমান্বিত এক রজনী

শবে ক্বদর: মহিমান্বিত এক রজনী

Advertisements In Feed
Advertisements

‘শবে ক্বদর’ দুটি শব্দ সমন্বিত নাম। নামটি যেমন আকর্ষণীয়। অর্থটিও তাৎপর্যপূর্ণ। ‘শব’ ফার্সি শব্দ। আরবি ভাষায় লাইলাতুন, এর অর্থ হল রাত, রজনী। ‘কদর’ শব্দের অর্থ সম্মান, মর্যাদা, মহাসম্মান। এ ছাড়া এর অন্য অর্থ হলো—ভাগ্য, পরিমাণ ও তাকদির নির্ধারণ করা। শরিয়তের আলোকে এ রাতের তাৎপর্য অনেক। রয়েছে নজরকাড়া ফজিলত ও গুরুত্ব।
এই রজনী সকল রজনীর সেরা। এই রজনী আল্লাহর রহমতে ঘেরা। এই রজনী বরকতে ভরা। এই রজনীর অনেক মর্যাদা। এই রজনী মহাসম্মানে বিভূষিত। এই রজনীতে যারা তাওবা করবে, তারাই হবে পূণ্যবান ঘোষিত। এই রজনীতে ইবাদতকারী-তাওবাকারীর ভাগ্যাকাশ আলোকিত হয়। মদ্যপানকারী, মা-বাবার অবাধ্য সন্তান, আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক বিচ্ছেদকারী, হিংসা-বিদ্বেষ বুকে লালনকারীর কপাল কলুষিত হয়। তাওবা করে এসব কাজ থেকে বিরত থাকলে ক্ষমাপ্রাপ্ত হবে। ক্ষমা না চাইলে ক্ষমা দেবেন না আল্লাহ।

কেন এই রজনীর এতো ফজিলত ? এ রজনী রমযান মাসের অন্তর্ভুক্ত । আর রমযান মাসে জান্নাতের দ্বার উন্মুক্ত থাকে। জাহান্নামের দরওয়াজা তালাবদ্ধ থাকে। শয়তান রুদ্ধ থাকে। রমযান মাস এমনিতেই ফজিলতে ভরা। বরকতে টইটম্বুর। তারজন্য এই রজনীটাও হয়ে উঠলো আল্লাহর কাছে মাকবূল, রহমতে ভরপুর। তাছাড়া এই রজনীতে মহাগ্রন্থ আলকুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। কারো মতে এই রাতে লাওহে মাহফুজ থেকে জিব্রাইল আলাইহিসসালামের ওপর নাযিল হয়। তিনি ধীরে ধীরে তেইশ বছরে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর অবতীর্ণ করেন। আবার কারো মতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর কোরআন অবতীর্ণের সূচনা হয় ওই রাতে।

এই রজনীর কথা কোরআনে সবিস্তারে বর্ণিত। বড়ো অক্ষরে লিখিত। বরং এক সূরা রূপে চিহ্নিত। সূরার নামটি হচ্ছে ‘সূরাতুল ক্বদর’। এই সূরায় খোদ আল্লাহ পাক এই রজনীর কথা বলছেন। আমার পাক কালাম অর্থাৎ কোরআন এই মহিমান্বিত রজনীতেই নাযিল করেছি। হে রাসূল! আপনি কি জানেন এই রজনী সম্পর্কে কিছু! এই রজনী হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। অর্থাৎ এক হাজার রাত ইবাদত করলে যে সওয়াব হতে পারে এই এক রাতের ইবাদতে তার চেয়েও বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। সে রাতে রহমতের ফেরেশতাদের আনাগোনা থাকে। (এ রাতে ফেরেশতাদের পৃথিবীতে নেমে আসার দুটি উদ্দেশ্য হতে পারে। এক. এ রাতে যারা ইবাদত – বন্দেগীতে মশগুল থাকে, ফেরেশতাগণ তাদের জন্য দুআ করে, যেন আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করেন। দুই. সারা বছরে যা-কিছু ঘটবে বলে তাকদীরে ফায়সালা হয়ে আছে, আল্লাহ তাআলা এ রাতে তা ফেরেশতাদের উপর ন্যস্ত করেন, যাতে তারা যথাসময়ে তা কার্যকর করেন)
সে রাতে শান্তি প্রবাহিত হবে। প্রশান্তির হাওয়া বইবে। ফজর পর্যন্ত শান্তি আর শান্তি থাকবে।
“.নিশ্চয়ই আমি এটা (অর্থাৎ কুরআন) শবে কদরে নাযিল করেছি । .তুমি কি জান শবে কদর কী ? শবে কদর এক হাজার মাস অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ । সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রূহ প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে অবতীর্ণ হয় । সে রাত আদ্যোপান্ত শান্তি- ফজরের আবির্ভাব পর্যন্ত। ” (সূরা ক্বদর)

এই মহীয়ান রজনীর ফজিলত বর্ণনায় খোদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পঞ্চমুখ হয়েছেন।
হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, শবে ক্বদরে হযরত জিবরাইল আ. ফেরেশতাদের বিরাট এক দল নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং যত নারী-পুরুষ নামাযরত অথবা জিকিরে মশগুল থাকে, তাদের জন্য রহমতের দোয়া করেন। (তাফসিরে মাযহারি)।

মিশকাত শরিফে উল্লেখ রয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. এরশাদ করেন, মহানবী সা. এরশাদ করেন, ‘যদি তোমরা কবরকে আলোকময় পেতে অচাও তাহলে লাইলাতুল ক্বদরে জাগ্রত থেকে ইবাদত করো।
রাসুলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, যদি কেউ ঈমানের সঙ্গে সাওয়াব লাভের খাঁটি নিয়তে লাইলাতুল ক্বদর কিয়ামুল্লাইল বা তাহাজ্জুদে অতিবাহিত করে তবে তার পূর্ববর্তী সকল গোনাহ ক্ষমা করা হবে। (বুখারি, হাদিস নং : ৬৭২)।
রাসূল সা. আরও বলেন, ‘রমজানের শেষ দশদিনে তোমরা কদরের রাত তালাশ করো। (মুসলিম, হাদিস নং: ১১৬৯)।

একবার হযরত উবায়দা রা. নবী করীম সা. কে লাইলাতুল কদরের রাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তখন নবীজী সেই সাহাবিকে বললেন, রমযানের বেজোড় শেষের দশ দিনের রাতগুলোতে তালাশ করো। (বুখারি, হাদিস নং: ২০১৭)।
রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, যদি কেউ লাইলাতুল ক্বদর খুঁজতে চায় তবে সে যেন তা রমযানের শেষ দশ রাত্রিতে খোঁজ করে। (মুসলিম, হাদিস নং : ৮২৩)। তাই ২১, ২৩, ২৫, ২৭, ২৯ রমজানের রাতগুলোকেই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
ইবনে মাজাহ শরিফে উল্লেখ রয়েছে, রাসূল সা. বলেন, যে লোক শবে ক্বদর থেকে বঞ্চিত হয় সে যেন সমগ্র কল্যাণ থেকে পরিপূর্ণ বঞ্চিত হলো।
আবু দাউদ শরিফে উল্লেখ রয়েছে, হযরত আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি লাইলাতুল ক্বদর পেলো কিন্তু ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমে কাটাতে পারলো না, তার মতো হতভাগা দুনিয়াতে আর কেউ নেই। ক্বদরের রাতের ইবাদতের সুযোগ যাতে হাতছাড়া হয়ে না যায় সেজন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ দশদিনের পুরো সময়টাতে ইতেকাফরত থাকতেন। (মুসলিম, হাদিস নং : ১১৬৭)।
রাসূল সা. বলেন, শবে ক্বদরকে নির্দিষ্ট না করার কারণ হচ্ছে যাতে বান্দা কেবল একটি রাত জাগরণ ও কিয়াম করেই যেন ক্ষ্যান্ত না হয়ে যায় এবং সেই রাতের ফজিলতের উপর নির্ভর করে অন্য রাতের ইবাদত ত্যাগ করে না বসে। তাই বান্দার উচিত শেষ দশকের কোন রাতকেই কম গুরুত্ব না দেয়া এবং পুরোটাই ইবাদাতের মাধ্যমে শবে ক্বদর অন্বেষণ করা।
হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একবার আমি রাসূল সা. কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমি যদি ক্বদরের রাত সম্পর্কে অবহিত হতে পারি তবে আমি কী করব? তখন রাসূল সা. আমাকে এই দুয়া পাঠ করার জন্য বললেন। ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি’। (তিরমিজি, হাদিস নং : ৩৫১)।

প্রতিটি দিন ফুরিয়ে চলে আসে রাত। এই ধারা অব্যাহত নিরন্তর। একজন বান্দা তাঁর মনিবের নৈকট্য লাভে ধন্য হতে পারে দিনরাত তথা প্রতিটি মুহুর্তে। কিন্তু কয়েকটি মুহুর্ত অমনও আছে যেটি কোরআন হাদিসের ভাষ্যমতে আল্লাহর কাছে মাকবূল। এরইমধ্যে হচ্ছে ক্বদরের রাত। এই রজনীর খোঁজ পেতে হলে, এই রজনীর শোভায় শোভিত হতে হলে নিজেকে নিযুক্ত করতে হবে আল্লাহর আরাধনায়। বিশেষ করে রমযানের শেষ দশকে পুরো ধ্যানমগ্ন হতে হবে। দক্ষ ডুবুরি যেমন মণি মুক্তা কুড়িয়ে আনতে এক ধ্যান হয়ে থাকেন, তেমনি এই রজনীর খোঁজ পেতে ওৎ পেতে বসতে হবে। হয় মহল্লার মসজিদে নিজেকে আটকিয়ে, আত্মীয় স্বজনদের মায়া ত্যাগ করে ব্যস্ত রাখবেন আল্লাহর আরাধনায়। না হয় বাড়িতে থেকেও তালাশ করুন এই রজনীকে। রমযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে অত্যধিক গুরুত্ব দিন। (ইসলামী তারিখে রাত আগে দিন পরে) ওই রাতগুলোতে কমপক্ষে চারটে টিপস অনুযায়ী আমল করুন।
এক. ওই রাতগুলোতে নামায পড়ুন। এতে নির্দিষ্ট কোনও সীমারেখা নেই। যতো নামায পড়বেন ততই লাভ। সওয়াবের অধিকারী হবেন। নিজের আমল নামায় সওয়াব যুক্ত হবে। আপনার আমলের ঝুলি কিছুটা হলেও সমৃদ্ধ হবে। কিন্তু তারিখ করে, মানুষ ডেকে মসজিদে একত্রিত হয়ে আমল করার কোনও যৌক্তিকতা নেই। এই রজনী নিজের ভাগ্যাকাশ উজ্জ্বল করার রজনী। একা একা ইবাদতে মশগুল থেকে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভে ধন্য হবার রজনী।

দুই. কোরআন তেলাওয়াত করুন। যেই কোরআনের একেকটি অক্ষর উচ্চারণে সওয়াব, সেই কোরআন রমযানে তেলাওয়াত করলে শতগুণ বেড়ে সওয়াব হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোরআন তেলাওয়াতের ফজিলত বর্ণনা করতে বলেছেন, কিয়ামতের দিবসে কোরআন তেলাওয়াতকারীদের আল্লাহ বলবেন, “কোরআন শরীফ পড়তে থাকো আর জান্নাতের সিঁড়ি বেয়ে ওঠো এবং থেমে থেমে পড়ো, যেমন তুমি দুনিয়াতে থেমে থেমে পড়তে। তোমার গন্তব্য সেখানেই যেখানে তোমার শেষ আয়াতের তেলাওয়াত খতম হবে। (তিরমিযী)”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, রোযা ও কোরআনে কারিম উভয়েই কিয়ামতের দিবসে বান্দার জন্য শাফায়াত করবে। রোযা বলবে, হে আল্লাহ! আমি তাকে খাবার ও নফসের চাহিদা পূরণ থেকে বিরত রেখেছি। অতএব আমার শাফায়াত কবুল করুন। কোরআন বলবে, হে আল্লাহ! আমি তাকে রাতের ঘুম থেকে বিরত রেখেছি। অতএব তার ব্যাপারে আমার শাফায়াত কবুল করুন। সুতরাং উভয়েই তার জন্য সুপারিশ করবে। ( মুসনাদে আহমাদ) “

তিন. আল্লাহর রাস্তায় দান করুন। যতটুকু সম্ভব দান করুন। গরিবরা চেয়ে থাকে ধনীদের হাতের দিকে। আপনার সম্পদে রয়েছে গরিবের হক। আপনি শুধু আল্লাহর ইবাদত করছেন কিন্তু আপনার পাশের বাড়ির একজনের পান্তাভাত খেয়ে দিন যাপিত হচ্ছে। আপনি সহনশীলতার সাথে দান করুন। বরং ওই রাতগুলোতে বেশি পরিমাণে দান করুন। হয়তো এর বিনিময়ে শবে ক্বদর আপনার ভাগ্য কেড়ে নেবে।

চার. অশ্রু ঝরিয়ে দোয়ায় মশগুল থাকুন। একা বসে তাহাজ্জুদের সময় মেহবুবের সাথে দুঃখ শেয়ার করুন। যা গুনাহ অজান্তে করে ফেলেছেন, দুহাত তুলে মাফ চেয়ে নেন। দোয়া হচ্ছে সকল ইবাদতের শেকড়। কেঁদে কেঁদে বলুন আল্লাহকে। যা চাওয়ার চেয়ে নেন। কারণ তিনি যা দেবেন তা দুনিয়ার কেউ দিতে পারবে না।

মুহাম্মাদ আবু সুফিয়ান
বাঁশডহর ১ম, হাইলাকান্দি

Rashid Qasimi

One thought on “শবে ক্বদর: মহিমান্বিত এক রজনী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top