Home » সদকায়ে ফিতরঃ গুরুত্ব, তাৎপর্য ও ফজিলত

সদকায়ে ফিতরঃ গুরুত্ব, তাৎপর্য ও ফজিলত

Advertisements In Feed
Advertisements

ফিতর মানে সমাপন,ভঙ্গন । শরীয়তের পরিভাষায় রমজান মাস শেষে ঈদুল ফিতরের সকালবেলা পবিত্র রমজান মাসের সমাপণ এবং ইদুল ফিতরের শুভাগমনের শোকরিয়া ও আনন্দস্বরূপ যে নির্ধারিত সদকা আদায় করা হয় সেটা হলো সদকায়ে ফিতর। এর দ্বারা সিয়াম সাধনার ত্রুটিবিচ্যুতি মার্জনা হয় । একমাসের সিয়াম সাধনায় একজন রোজাদারের অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়, যার কারণে রোজা ভঙ্গ হয় না ঠিকই, কিন্তু রোজার ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যায়। রোজার এসব ত্রুটি মার্জনার জন্যই সাদাকাতুল ফিতর ;যেমন একজন রোজাদার ব্যক্তি দিনের বেলায় পানাহার করেনি, স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করেনি, যার কারণে তার রোজা নষ্ট হয়নি বটে, কিন্তু পরনিন্দা করেছেন,অশ্লীল কথাবার্তা বলেছেন, অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা থেকে বিরত থাকেন নি, এতে তার রোজা ত্রুটিপূর্ণ হয়েছে। এ থেকে রোজাকে পরিচ্ছন্ন ও পরিশুদ্ধ করার জন্যই সাদাকাতুল ফিতর। তাছাড়া দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর আল্লাহ তায়ালা মেহেরবাণী করে ঈদের দিনে পানাহারের অনুমতি দিয়েছেন, উপবাস ভঙ্গন দিবসের আনন্দ উদযাপন ও কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সাদাকাতুল ফিতর নির্ধারণ করা হয়েছে।

গরীব-দরিদ্র মানুষগুলো এই সমাজেরই অঙ্গ। সারাটা বছর দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করে কষ্টসাধ্য জীবন যাপন করেন। তারা ঈদের দিন যাতে ঈদ আনন্দে সকলের সাথে সামিল হতে পারেন; এজন্য তাদের কিছু খাদ্য ও বস্ত্রের ব্যবস্থা করে দেয়ার জন্য ইসলাম সদকায়ে ফিতর বিত্তবানদের উপর আবশ্যক করেছে।

হাদিসের আলোকে ফিতরা।
১.হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাঃ হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন,রোজাকে অপ্রয়োজনীয়,অশ্লীল কথাবার্তা ও কার্যকলাপ থেকে পরিচ্ছন্ন করার জন্য এবং মিসকীনদের কিছু খাদ্যের ব্যবস্থা করার জন্য যাকাতুল ফিতর ফরজ করা হয়েছে। (আবু দাউদ, ইবনে মাজা)
২.হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাঃ থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সদকায়ে ফিতর মুসলমানদের উপর ওয়াজিব। হোক সে স্বাধীন বা ক্রিতদাস, হোক সে পুরুষ কিংবা মহিলা,হোক সে ছোট অথবা বড়। (বোখারী শরীফ)
৩.হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাঃ বর্ণনা করেন, হুজুর সাঃ রমজানের শেষে বলেছেন, আপনাদের রোজার সদকা আদায় কর। (আবু দাউদ শরীফ)
৪. মহানবী সাঃ একজন ঘোষককে পাঠালেন তিনি যেন মক্কার ওলিতে গলিতে ঘোষণা করেন যে, সদকায়ে ফিতর সব মুসলমানের উপর ওয়াজিব। হোক সে স্বাধীন বা ক্রিতদাস, হোক পুরুষ কিংবা মহিলা, হোক ছোট বা বড়। (তিরমিজি শরীফ)

কাদের উপর ফিতরা ওয়াজিব?
যে মুসলমানের উপর যাকাত ওয়াজিব বা যাকাত ওয়াজিব নয় কিন্তু ঋণ এবং প্রয়োজনীয় ও ব্যবহারিক বস্তু ছাড়া এমন মূল্যের আসবাবপত্র বা অর্থ আছে যার পরিমাণ সাড়ে বাহান্ন তোলা রূপার সমতূল্য বা এরবেশি; তার উপর সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব। হোক সে অর্থ সম্পদ বা মাল আসবাব ব্যবসায়িক সূত্রের বা অন্য কিছু। সদকায়ে ফিতরের ক্ষেত্রে অর্থ সম্পদের বছর বিগত হওয়া শর্ত নয়। ঈদের দিনও যদি ঐ পরিমাণ অর্থ সম্পদের মালিক হন, তাহলে সদকায়ে ফিতর আদায় করা আবশ্যক হয়ে যাবে।

কাকে দিবেন ফিতরা ?

সাদাকাতুল ফিতর পাওয়ার উপযুক্ত তারাই, যারা যাকাত গ্রহনের উপযুক্ত। তবে সমাজের দরিদ্র-অনাথ এবং গরীব আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশীকে দেয়াটাই অধিক উত্তম। কেননা হাদিসে সাদাকাতুল ফিতর আদায়ের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, দরিদ্রের খাবারের ব্যবস্থা করা। অতএব সাদাকাতুল ফিতর একমাত্র দরিদ্র-অনাথকে দিয়ে ঈদের আনন্দে তাদের শামিল করবেন এবং নিজের রোজাকে ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে পরিচ্ছন্ন করবেন- এটাই হবে সাদাকাতুল ফিতরের লক্ষ্য।

কখন আদায় করবেন?
ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সদকায়ে ফিতর আদায় করার আদেশ দিয়েছেন লোকদের নামাজে বের হওয়ার পূর্বে।’ (বুখারী শরীফ ১৫০৯ )
তবে ফিতরা আদায়ের সময় শুরু হয় ঈদুল ফিতরের সকালবেলা সূর্য উদয়ের সাথে সাথে । ফিতরা আদায় করার উত্তম সময় হচ্ছে ঈদের নামাজে বের হওয়ার পূর্বক্ষণ।
কেউ ঈদের এক দু’দিন পূর্বেও তা আদায় করতে পারে। কারণ সাহাবিদের মধ্যে কেউ কেউ ঈদের এক দু’দিন পূর্বে তা আদায় করতেন। (বুখারী, নং ১৫১১)
কেউ ঈদের পরে ফিতরা দিলে সেটা সাধারণ দান হিসাবে গণ্য হবে এবং সে ফিতরার বিশেষ ফজিলত ও মর্যাদা হতে বঞ্চিত থাকবে। (আবু দাউদ)
ফিতরা আদায়ের ফজিলতঃ
হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, হুজুরে আনোয়ার (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘‘যতক্ষণ পর্যন্ত সদকায়ে ফিতর আদায় করা হয় না, ততক্ষণ পর্যন্ত বান্দার রোজা জমিন ও আসমানের মাঝখানে ঝুলন্ত থাকে।’’(কানযুল উম্মাল, ৮ম খণ্ড)

ফিতরার পরিমাণঃ প্রত্যেকের জন্য মাথা পিছু এক ‘সা’ পরিমাণ কিসমিস,খেজুর ও যব বা অর্ধ ‘সা’ পরিমাণ গম অথবা এর মূল্য আদায় করা আবশ্যক। ‘সা’ হচ্ছে মহানবী সাঃ এর সময়ের এক ধরনের ওজনের পাত্র। বর্তমান ওজন হিসেবে এক ‘সা’ হচ্ছে ৩২৬৬ গ্রাম এবং অর্ধ ‘সা’ হচ্ছে ১৬৩৩ গ্রাম। সাধারণ মুসলমানদের সুবিধার্থে উলামায়ে কেরাম বর্তমান সময়ে ফিতরার পরিমাণ ঘোষণা করে থাকেন। যাতে আমজনতাকে ঐ ‘সা’ এর হিসেব নিকেষের সমস্যায় পড়তে না হয়। এবং সহজে ফিতরার পরিমাণ পেয়ে আদায় করে নেন। উত্তর পূর্ব ভারতে এই সহজ এবং জনমুখী পদ্ধতটির ধারাবাহিকতা শুরু করেছিলেন উত্তর পূর্ব ভারতের প্রথম আমীরে শরীয়ত হযরত মাওলানা আব্দুল জলিল চৌধুরী রাহঃ। এরপর প্রতি বছর উত্তর পূর্ব ভারত এমারতে শরয়ীয়াহ ফিতরার পরিমাণ ঘোষণা করে আসছে। এবছরও উত্তর পূর্ব ভারতের আমীরে শরীয়ত হযরত মাওলানা ইউসুফ আলী সাহেবের নির্দেশে কেন্দ্রীয় কাজিয়ে শরীয়ত মাওলানা ইসমাইল আলী লস্কর সাহেব ফিতরার পরিমাণ ঘোষণা করেছেন যেটা নীচে তোলে ধরা হল।
১.কিসমিসের মূল্য অনুযায়ী ফিতরার পরিমাণঃ ৮১৬.৫০ টাকা
২. খেজুরের মূল্য অনুযায়ী ফিতরার পরিমাণঃ৩২৬.৬০ টাকা
৩,আটার মূল্য অনুযায়ী ফিতরার পরিমাণঃ ৪৯.০০ টাকা।

Rashid Qasimi

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top