ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠপর্যায়ে প্রস্তুতি সম্পন্ন করলেও অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা পুলিশের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যে বাজেট বরাদ্দ পাওয়া গেছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় কম হওয়ায় অতিরিক্ত টহল, যানবাহন ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিগত সেবায় চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।
সূত্র জানায়, নির্বাচন উপলক্ষে পুলিশ বাহিনী এ পর্যন্ত ২৮৯ কোটি ৪৯ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। তবে এই অঙ্কে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয় পুলিশ। কারণ, তারা সরকারের কাছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বাজেট দাবি করেছিল। এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছেও জোরালোভাবে দাবি জানানো হয়। জুলাই বিপ্লবের পর দেশের বিভিন্ন থানার ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত এবং নতুন অস্ত্র ও সরঞ্জাম সংগ্রহে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হওয়ায় নির্বাচনকালে অতিরিক্ত সরঞ্জাম কিনতে বাড়তি বরাদ্দ প্রয়োজন ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, নির্বাচনের সময় টহল কার্যক্রম জোরদার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে যানবাহনের সংকট এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ফলে আসন্ন নির্বাচনে টহল কার্যক্রম পরিচালনা করা পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তহবিলের সীমাবদ্ধতা এবং অন্যান্য খাতে নির্বাচনি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এবার তুলনামূলক কম বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মন্তব্য জানতে চাইলে বুধবার রাতে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের একজন অতিরিক্ত আইজিপি জানান, গত দুই মাস ধরে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে নির্বাচনি বাজেট নিয়ে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হয়েছে। চাহিদার তুলনায় কম বরাদ্দ পাওয়ায় পুলিশ কিছুটা হতাশ হলেও নির্বাচন শেষে সরকার অতিরিক্ত থোক বরাদ্দ দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
যানবাহন সংকট এখনো বড় সমস্যা
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই বিপ্লবের সময় সারাদেশে ১০৫টি থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে মোট ৪৫৫টি যানবাহন ধ্বংস হয়। এসবের মধ্যে ছিল ১৩টি জিপ, ১৭৩টি ডাবল কেবিন পিকআপ, ৫৬টি সিঙ্গেল কেবিন পিকআপ, ১২টি পেট্রল কার, ১২টি মাইক্রোবাস, দুটি অ্যাম্বুলেন্স, ১২টি ট্রাক, দুটি বাস, দুটি প্রিজন ভ্যান, ১৫৬টি মোটরসাইকেল, আটটি রেকার, চারটি এপিসি, একটি জলকামান এবং দুটি ক্রাইমসিন ম্যানেজমেন্ট ভ্যান।
এই সংকট মোকাবিলায় পুলিশের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২২৮টি নতুন গাড়ি কেনার উদ্যোগ নেয় এবং এ বিষয়ে ২০২৫ সালের ৮ জানুয়ারি অর্থ বিভাগে চিঠি পাঠানো হয়। তবে নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসায় নতুন যানবাহন সংগ্রহ কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। ফলে সংকট এখনো রয়ে গেছে।
পুলিশ সদর দপ্তর মনে করছে, যানবাহনের অভাবে টহল কার্যক্রমে কিছুটা ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তবে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পরিস্থিতি সামাল দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
যেসব এলাকায় টহল সীমিত রাখা হচ্ছে, সেখানে উঠান বৈঠকের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি বিট পুলিশিং ও কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে। পুলিশের আশা, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে নির্বাচনের পরিবেশ স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র আরও জানায়, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় পুলিশি নিরাপত্তায় ব্যালট পেপার ও অন্যান্য নির্বাচনি সরঞ্জাম পরিবহন শুরু হয়েছে। ভোটকেন্দ্রগুলোতে পুলিশের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্যান্য সংস্থাও দায়িত্ব পালন করছে। একই সঙ্গে পিকেট পার্টি, মোবাইল টিম এবং সাদা পোশাকে থাকা সদস্যরাও মাঠে কাজ করছেন।




